নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

রোববার,

০২ অক্টোবর ২০২২

গোরখোদক মোতালেব আজ অসহায়

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:১৫:৩১, ৩১ আগস্ট ২০২২

গোরখোদক মোতালেব আজ অসহায়

মোতলেব মিয়া (৬৭)। নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের খামার পাড়া গ্রামের মৃত মনছুর আলীর ছেলে। এক সময় দিন মজুরের কাজ করলেও এখন বয়সের ভারে নুজ্জ মোতলেব মিয়া এখন বেকার। তবে টুকটাক কবিরাজি করেন। কবিরাজে এখন আর মানুষ আগের মত ভক্তি নেই। পেশায় কবিরাজ হলেও এলাকায় তিনি একজন গোরখোদক নামে পরিচিত। এলাকায় মৃত মানুষের কবর খুঁড়ে থাকেন। একজন মানুষের বিদায়কালীন শেষ সম্বল হলো তার সাড়ে ৩ হাত জায়গা। যে অন্ধকার মাটির ঘরে অন্ততকাল অবস্থান করতে হবে মৃত মানুষটির। আর এই মৃত ব্যক্তির কবর খুড়ে শান্তি পান তিনি।

 


মোতলেব মিয়া বলেন, সেই ৭ বছর বয়স থাকতে শুরু করেছি। এখনও কবর খুঁড়ি। সত্যি কথা বলতে কি ছোট্ট বেলায় মেজবানি (মৃত মানুষের কুলখানি) খাওয়ার জন্যই কবর খোঁড়তাম। বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন মোতলেব মিয়া। তিনি আরো বলেন, সেই ছোট্ট বেলা থেকে শুরু করছি এখনও চলছে। দেড় শতাধিক মৃত মানুষের কবর খোঁড়েছি আমি। ছোট্ট বেলায় আমার এ কাজে ওস্তাদ ছিল নগরপাড়ার আজিজ মিয়া ও নুরা ভাই। এখন আার আগের মত পারি না। তারপরও নেশা হয়ে গেছে। কেউ মারা গেলে বসে থাকতে পারি না। 

 


বয়সের ভারে কাজকর্ম করতে পারেন না মোতলেব মিয়া। ছেলে সন্তান না থাকায় সাংসারিক খরচ চালাতে হিমসিম খাচ্ছেন তিনি। বয়স ৬৭ পার হলেও আজও অবধি পাননি কোনো বয়স্ক ভাতা বা কোনো প্রকার সরকারি সাহায্য। নির্বাচন এলে মেম্বার চেয়ারম্যানরা বলেন এই বার তোরে বয়স্ক ভাতাসহ বিভিন্ন সরকারি সুযোগ সুবিদা দিব। নির্বাচন চলে গেলে আর কেউ খবর নেন না দেড় শতাধিক গোরখোদক মোতলেব মিয়ার। 

 


কায়েতপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান গোলজার হোসেন, বয়োবৃদ্ধ জয়নাল আবেদীন, মো. হাসেম, ইব্রাহিম সরদার, তোফাজ্জেল হোসেনসহ কয়েকজন জানান, মোতলেব সেই ছোট্ট বেলা থেকেই শুরু করেন এই কবর খোঁড়ার কাজ। দেখতে দেখতে এ কাজেই পার করে দিয়েছেন প্রায় ৬০ বছর। পিতা-মাতা, শ্বশুর-শ্বাশুড়িসহ প্রতিবেশীদের কবর খুঁড়েছেন নিজ হাতেই। এ পর্যন্ত তার নিজ হাতে কবর খোঁড়ার সংখ্যা দেড় শতাধিকের বেশি। 

 


একটি সময় ছিল যখন একজন মানুষ মারা গেলে তার দাফন-কাফনের জন্য নির্দিষ্ট মানুষ পাওয়া যেত না। বিভিন্ন মানুষকে অনুরোধ করে আনতে হতো দাফন, কাফন করানোর জন্য। তাই এসব কাজে তেমন কেউ আগ্রহী না থাকায় তিনি এ উদ্যোগ নেন এবং আজ অব্যবধি নানা সমস্যার মধ্যে দিয়েও চালিয়ে যাচ্ছেন এই মহৎ কাজটি। এই কাজের জন্য এলাকায় মোতলেব মিয়া একজন গোরখোদক নামে বেশ সুপরিচিত। 

 


একমাত্র কন্যা সন্তানের জনক মোতলেব মিয়া বলেন, ‘যার জীবন আছে মৃত্যু তার সুনিশ্চিত। মৃত্যু হবে না এমন ধারণা পোষণ করা বোকামির কাজ। আমি এখান থেকে আরও চল্লিশ বছর আগে এই কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করি। একটা কবর খুঁড়তে যেসব যন্ত্রপাতি প্রয়োজন, সেগুলোর সব আমার রয়েছে। আমি কবিরাজি করেই মূলত সংসার চালাই। তাই কোনো অঞ্চলে কাজ করতে যাওয়ার আগে বলি রাখি, যদি আমার প্রতিবেশী কেউ মারা যান, খবর পাওয়া মাত্রই আমি কাজ ছেড়ে চলে আসি তার কবর খোঁড়ার জন্য।’

 


মোতলেব মিয়া বলেন, ‘দীর্ঘ দিন এ কাজ করতে গিয়ে অনেক বিপদ-আপদের সম্মুখীন হয়েছি। কত কবর খুঁড়তে গিয়ে হাড়, মাথার খুলিও পেয়েছি। এমনও হয়েছে বৃষ্টিকালে কবর খুঁড়তে গিয়ে পানিতে ভরে উঠেছে কবর। আর সেই পানি সরানোর জন্য একটা পাত্র দেবে এমন মানুষ অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেক কবর খুঁড়তে গিয়ে পাশের কবর থেকে আসা ময়লা পানিতে আমার গোড়ালি ভিজে গিয়েছে। পরে আমি ২/৩ মাস ঠিকমতো খেতে ও ঘুমাতে পারিনি। তবুও আমি একদিন মারা যাবো। পৃথিবীর এই মায়া ত্যাগ করে আমাকে চলে যেতে হবে এই চিন্তা করে আমি এ কাজ ছাড়িনি।’ 
এসময় তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের কবর খুঁড়ে যেতে চান বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 


রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল হক বলেন, গোরখোঁড়া একটা মহান কাজ। এ কাজে কেউ কোনো পারিশ্রমিক দেয় না। তারপরও এরা স্বেচ্ছায় এ কাজ করেন। বয়স হওয়ার পরও কেন ভাতা পাচ্ছেন না, তা আমার জানা নেই। সরকারি কোনো সুযোগ সুবিদা না পেয়ে থাকলে আমার কাছে আসলে আমি ব্যবস্থা করে দিব অথবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বলে দেব উনাকে সুযোগ সুবিদা প্রদান করতে। 

সম্পর্কিত বিষয়: