রূপগঞ্জে সড়কে ময়লার ভাগাড়, নাকাল জনজীবন
রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল চৌরাস্তা এলাকার গুরুত্বপূর্ণ এশিয়ান হাইওয়ে বাইপাস সড়কটি এখন যেন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সড়কের ওপর গড়ে ওঠা বিশাল ময়লার ভাগাড় থেকে ছড়িয়ে পড়ছে অসহনীয় দুর্গন্ধ, যা প্রতিদিন হাজারো পথচারী, যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। এই পরিস্থিতি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ হুমকিতে রূপ নিচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোলাকান্দাইলসহ আশপাশের বিভিন্ন হাটবাজার, মাছ ও সবজির আড়ত, দোকানপাট এবং আবাসিক এলাকার বর্জ্য নিয়মিতভাবে এনে ফেলা হচ্ছে এই সড়কের ওপর। দিনের পর দিন জমে থাকা এসব বর্জ্য পচে তৈরি হচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। সড়কের একাংশ দখল করে থাকা এই ময়লার স্তূপের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। সড়ক দিয়ে চলাচলরত পথচারীরা নাকে রুমাল বা কাপড় চেপে কোনোভাবে এলাকা অতিক্রম করছেন। অনেকেই জানান, কয়েক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। বৃষ্টি হলে পচা ময়লা পানির সঙ্গে মিশে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, সৃষ্টি হয় আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি। তখন সড়কটি যেন একটি অস্থায়ী নর্দমায় পরিণত হয়।
যেখানে এই ময়লার ভাগাড় গড়ে উঠেছে, তার কাছেই রয়েছে একটি ব্যস্ত বাসস্ট্যান্ড। এই স্ট্যান্ড থেকে দেশের পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে। ফলে প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই দুর্গন্ধময় পরিবেশের শিকার হচ্ছেন। স্থানীয়দের দাবি, এই পরিস্থিতির কারণে অনেককে হাসপাতালে পর্যন্ত নিতে হয়েছে।
বাসচালক হেকমত আলী খান বলেন, এই সড়ক এখন চালকদের জন্য এক ধরনের ফাঁদে পরিণত হয়েছে। ময়লার স্তূপের কারণে রাস্তার অবস্থা খারাপ হয়ে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নতুন চালকরা না বুঝে এই গর্তে পড়ে বিপদে পড়ছেন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
পথচারী নেয়ামত উল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। অথচ এখানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে দাঁড়ানোই যায় না। দুর্গন্ধে শ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা বারবার অভিযোগ করেও কোনো স্থায়ী সমাধান পাইনি। কলেজশিক্ষার্থী আমেনা আক্তার শিউলি বলেন, প্রতিদিন পড়াশোনার জন্য এই পথ দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু ময়লার গন্ধ এতটাই তীব্র যে নাকে রুমাল চেপেও কোনো লাভ হয় না। অনেক সময় মাথা ঘুরে যায়।
পরিবেশবিদ বন্দনা শিবা এ প্রসঙ্গে বলেন, অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি নীরব কিন্তু ভয়াবহ সংকট, যা ধীরে ধীরে মানুষের জীবনযাত্রা, পরিবেশ এবং অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। খোলা স্থানে পচনশীল বর্জ্য জমে থাকলে সেখান থেকে মিথেনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। একই সঙ্গে এসব বর্জ্য থেকে ছড়ানো জীবাণু মানুষের শরীরে মারাত্মক রোগের সৃষ্টি করতে পারে। একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আধুনিক ডাম্পিং সিস্টেম, পুনর্ব্যবহার কার্যক্রম এবং সর্বোপরি জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
স্থানীয় ডিকেএমসি হসপিটাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, এই এলাকায় একাধিক হাসপাতাল রয়েছে। রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে এসে উল্টো ময়লার দুর্গন্ধে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
রূপগঞ্জ উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আইভী ফেরদৌস খান বলেন, পচা ময়লা থেকে উৎপন্ন গ্যাস ও জীবাণু মানুষের শরীরে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, অ্যালার্জি এবং ভাইরাসজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি আরও বিপজ্জনক।
গোলাকান্দা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন মোল্লা বলেন, উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে আমরা নিয়মিতভাবে ময়লা পরিষ্কার করার চেষ্টা করি। কিন্তু নির্দিষ্ট ডাম্পিংয়ের স্থান না থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ময়লা জমে যায়। স্থায়ী সমাধানের জন্য নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা চালু করা অত্যন্ত জরুরি।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা নিয়মিতভাবে সড়কটি পরিষ্কার করার জন্য অভিযান চালাচ্ছি। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। ইতোমধ্যে ময়লা ডাম্পিংয়ের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করছি, আগামী এক মাসের মধ্যে সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম শুরু করা যাবে।