নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

শনিবার,

০৭ নভেম্বর ২০২৬

রঙিন মাছের বর্ণিল জগতে মুগ্ধ দর্শনার্থীরা অর্নামেন্টাল ফিশ ফেয়ার অ্যান্ড শো শুরু

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:১৯:৩৯, ৬ নভেম্বর ২০২৬

রঙিন মাছের বর্ণিল জগতে মুগ্ধ দর্শনার্থীরা  অর্নামেন্টাল ফিশ ফেয়ার অ্যান্ড শো শুরু

স্বচ্ছ কাচের ছোট্ট জলজ জগতে যেন রঙের এক অপূর্ব উৎসব! লাল, নীল, হলুদ, কমলা কিংবা বাহারি রঙের মাছগুলো আপন মনে সাঁতার কাটছে অ্যাকুরিয়ামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। পানির নিচে তাদের ছুটে চলা, বিচিত্র আকৃতি আর চোখজুড়ানো সৌন্দর্য মুহূর্তেই কেড়ে নিচ্ছে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি। ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝে এমন একটি ছোট্ট অ্যাকুরিয়াম যেমন এনে দিতে পারে প্রশান্তি, তেমনি প্রকৃতির সঙ্গে গড়ে তুলতে পারে এক অনন্য সম্পর্ক।

রঙিন মাছের এই বর্ণিল জগৎকে ঘিরেই রাজধানী ঢাকায় শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ অর্নামেন্টাল ফিশ ফেয়ার অ্যান্ড শো ২০২৬’। শৌখিন মাছ পালন, অ্যাকুরিয়াম শিল্প ও অ্যাকুয়াস্কেপিংকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর ইস্কাটনের অ্যাবাকাস কনভেনশন সেন্টারে ফিতা কেটে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন আজাদ ফিসারিজের প্রধান উদ্যোক্তা তাজুল ইসলাম রাজিব। এ সময় আয়োজক, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও মাছপ্রেমীরা উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনের পর থেকেই মেলা প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। প্রথম দিনেই শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ, সব বয়সী মানুষের মধ্যে দেখা যায় ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ।

মেলায় রয়েছে ৬০টি স্টল। এসব স্টলে পাওয়া যাচ্ছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির শৌখিন মাছ, যার দাম ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত। মাছের পাশাপাশি রয়েছে আধুনিক অ্যাকুরিয়াম, উন্নতমানের ফিল্ট্রেশন সিস্টেম, মাছের খাবার, জলজ উদ্ভিদ, অ্যাকুয়াস্কেপিংয়ের প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং মেরিন অ্যাকুরিয়ামের আধুনিক প্রযুক্তি। দর্শনার্থীদের জন্য বিভিন্ন পণ্যে থাকছে বিশেষ অফারও।

একেকটি স্টলে সাজানো হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির মাছ। কোথাও ছোট্ট রঙিন গাপ্পি, কোথাও নজরকাড়া গোল্ডফিশ, আবার কোথাও আকার ও গঠনে ব্যতিক্রমী ফ্লাওয়ারহর্ন। এসব মাছের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। বিশেষ করে শিশুদের কাছে রঙিন মাছের অ্যাকুরিয়াম হয়ে উঠেছে অন্যতম আকর্ষণ।

শুধু মাছ কেনাবেচা কিংবা প্রদর্শনী নয়, মেলাটিকে ঘিরে আয়োজন করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতারও। এর মধ্যে রয়েছে ফ্লাওয়ারহর্ন, গোল্ডফিশ, গাপ্পি, মলি ও বেটা মাছের সৌন্দর্য, গঠন ও গুণগত মান যাচাইয়ের প্রতিযোগিতা। পাশাপাশি থাকছে হার্ডস্কেপ ও অ্যাকুয়াস্কেপিং প্রতিযোগিতা। এসব প্রতিযোগিতায় দেশি-বিদেশি অভিজ্ঞ বিচারকেরা অংশ নিচ্ছেন।

অ্যাকুয়াস্কেপিংয়ের মাধ্যমে পানির নিচে প্রাকৃতিক পরিবেশের অনুকরণে তৈরি করা হয় নান্দনিক জলজ দৃশ্য। পাথর, কাঠ, বালু ও জলজ উদ্ভিদের সমন্বয়ে তৈরি এসব দৃশ্য যেন কাচের ভেতর একেকটি ক্ষুদ্র প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি। মেলায় অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ পাচ্ছেন।

এ ছাড়া প্রতিদিন দর্শনার্থীদের জন্য থাকছে বিনামূল্যে লাইভ মেরিন অ্যাকুরিয়াম সেটআপ প্রদর্শনী। এতে সরাসরি অ্যাকুরিয়াম স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ পালনের বিভিন্ন কৌশল তুলে ধরা হচ্ছে। ফলে নতুন করে অ্যাকুরিয়াম তৈরিতে আগ্রহী ব্যক্তিরাও প্রয়োজনীয় ধারণা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারছেন।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অ্যাকুরিয়াম ব্যবসায়ী, শৌখিন মাছের প্রজননকারী, অ্যাকুয়াস্কেপার, আমদানিকারক এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে মেলাটি পরিণত হয়েছে সংশ্লিষ্টদের এক মিলনমেলায়।

আয়োজকেরা জানান, বাংলাদেশের অর্নামেন্টাল ফিশ বা শৌখিন মাছের শিল্প ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে এ খাতকে সুসংগঠিত শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত প্রজননব্যবস্থা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। একই সঙ্গে দেশীয় প্রজননকারী, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করাও জরুরি।

বাংলাদেশে শৌখিন মাছ পালন ও অ্যাকুরিয়াম সংস্কৃতির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এ শখ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। শুধু শখ পূরণ নয়, পরিকল্পিতভাবে এ খাতকে এগিয়ে নেওয়া গেলে তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ।

শৌখিন মাছের প্রজনন, অ্যাকুরিয়াম তৈরি, মাছের খাবার উৎপাদন, জলজ উদ্ভিদ চাষ, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং অ্যাকুয়াস্কেপিংয়ের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে গড়ে উঠতে পারে নতুন ব্যবসা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দেশেই উন্নতমানের শৌখিন মাছ উৎপাদন করা সম্ভব হলে রপ্তানির নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক মানের এ আয়োজন দেশের অর্নামেন্টাল ফিশ খাতের উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার, দেশীয় মাছের প্রজননব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আজাদ ফিসারিজের প্রধান উদ্যোক্তা তাজুল ইসলাম রাজিব বলেন, তাঁদের লক্ষ্য শুধু একটি মাছের মেলার আয়োজন করা নয়; বরং বাংলাদেশের শৌখিন মাছ ও অ্যাকুরিয়াম শিল্পকে একটি সম্মানজনক, টেকসই ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত শিল্পে পরিণত করা। নতুন প্রজন্ম যেন এই শখের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, সৃজনশীলতা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে পারে, সেই সুযোগ তৈরি করাই তাঁদের অন্যতম উদ্দেশ্য।

চার দিনব্যাপী এ মেলা চলবে ৮ নভেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে মেলা প্রাঙ্গণ। সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, সব দর্শনার্থীর জন্য মেলায় প্রবেশ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।

রঙিন মাছের সৌন্দর্য উপভোগ, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়া কিংবা অ্যাকুরিয়াম শিল্পে নতুন সম্ভাবনার খোঁজ, সব মিলিয়ে রাজধানীর এই আয়োজন হয়ে উঠেছে মাছপ্রেমীদের জন্য এক ব্যতিক্রমী আকর্ষন।

সম্পর্কিত বিষয়: