নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

বৃহস্পতিবার,

১৫ অক্টোবর ২০২৬

সোনারগাঁয়ের কৃতি সন্তান কবি হাসান হাফিজের ৭১তম জন্মদিন আজ

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:২২:১৮, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

সোনারগাঁয়ের কৃতি সন্তান  কবি হাসান হাফিজের ৭১তম জন্মদিন আজ

বাংলা সাহিত্যের সত্তর দশকের কবি, সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক হাসান হাফিজের ৭১তম জন্মদিন আজ ১৫ অক্টোবর। ১৯৫৫ সালের এই দিনে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার এলাহিনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দীর্ঘ পাঁচ দশকের সাহিত্য ও সাংবাদিকতা জীবনে সৃজনশীলতার নানা শাখায় নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছেন এই কবি। কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, রম্যরচনা, গবেষণা, সাক্ষাৎকার, ফিচার ও শিশুসাহিত্য—বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর অবাধ বিচরণ তাঁকে করে তুলেছে বহুমাত্রিক লেখক।

প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক। এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থই ষাটের বেশি। মৌলিক ও সম্পাদিত গ্রন্থ মিলিয়ে তাঁর সাহিত্যভান্ডার ক্রমেই সমৃদ্ধ হয়েছে। বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দুটি দ্বিভাষিক কাব্যগ্রন্থ। তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে ইংরেজি, ফরাসি, চীনা, স্প্যানিশ, জার্মান, জাপানি, হিন্দি, উর্দু, আরবি, ফারসি ও চাকমাসহ বিভিন্ন ভাষায়। ফলে তাঁর সাহিত্যচর্চা বাংলা ভাষার গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছেও পৌঁছেছে।

সোনারগাঁও থেকে জাতীয় পরিসরে

সোনারগাঁওয়ের মাটি ও জনজীবনের সঙ্গে শৈশব থেকে যুক্ত হাসান হাফিজ পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। দুই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এই সাহিত্যিকের শিক্ষাজীবন তাঁর বহুমুখী পেশাগত ও সৃজনশীল পথচলার ভিত্তি তৈরি করে।

তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা দৈনিক বাংলায়। পরবর্তী সময়ে দৈনিক জনকণ্ঠ, কলকাতার সাপ্তাহিক দেশ, বৈশাখী টেলিভিশন ও দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদক এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের পেশাগত সংগঠনেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। 

 

কবিতায় প্রেম, মানবিকতা ও সময়ের অনুরণন

 

হাসান হাফিজের কবিতায় প্রেম, মানবিক অনুভূতি, ব্যক্তিমানস, সমাজবাস্তবতা ও সময়ের নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে। তাঁর লেখায় একদিকে রয়েছে ব্যক্তিগত অনুভবের প্রকাশ, অন্যদিকে রয়েছে জীবন ও সমাজকে পর্যবেক্ষণের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। কবিতার পাশাপাশি ছড়া, রম্যরচনা ও শিশুসাহিত্যেও তিনি সমানভাবে সক্রিয়। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় দীর্ঘদিনের চর্চা তাঁর লেখকসত্তাকে দিয়েছে বৈচিত্র্য ও ব্যাপ্তি।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘এখন যৌবন যার’, ‘অবাধ্য অর্জুন’, ‘হয়তো কিছু হবে’, ‘দূরে পাহাড়ের ঘুম’, ‘তৃষ্ণার তানপুরা’, ‘ভালোবাসার অগ্নিচুমুক’, ‘নীরবতাই অস্ত্র আমার’, ‘ধাবমান সন্ধ্যার গৌরব’, ‘ছায়ামানুষ ভাঙামানুষ’, ‘অপেক্ষা এক নদীর নাম’, ‘পিপাসা ও পরম্পরা’ ও ‘অপমানে বেজে উঠি’। এসব গ্রন্থ তাঁর দীর্ঘ কাব্যচর্চার পরিচায়ক। 

 

শিশুসাহিত্যে স্বীকৃতি, অর্জনের মুকুটে নতুন পালক

শিশু-কিশোরদের জন্য তাঁর লেখালেখি হাসান হাফিজের সাহিত্যজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। ছোটদের উপযোগী রচনা, ছড়া ও কল্পনানির্ভর সাহিত্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি এই পাঠকগোষ্ঠীর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। শিশুসাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫। এ পুরস্কার তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যসাধনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। 

 

এ ছাড়া শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক, ডাকসু সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় প্রেস ক্লাব লেখক সম্মাননা, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি সাহিত্য পুরস্কার এবং কলকাতার সৌহার্দ্য কবিতা উৎসবের সম্মাননাসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। সাহিত্য ও সাংবাদিকতা—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর দীর্ঘ পথচলা তাঁকে আলাদা মর্যাদা এনে দিয়েছে। 

 

নীরব স্বভাব, নিরলস সাধনা

 

বিপুলসংখ্যক গ্রন্থ রচনা, সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন এবং নানা পুরস্কার অর্জনের পরও হাসান হাফিজকে ঘিরে যে পরিচয়টি বিশেষভাবে আলোচিত, তা হলো তাঁর পরিশ্রমী ও অনাড়ম্বর স্বভাব। উচ্চকিত প্রচারের চেয়ে লেখালেখি ও কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করাই তাঁর পথ। সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতা এবং পেশাগত দায়িত্বের সমান্তরাল বহন তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

একজন কবির জীবন কেবল কবিতার পঙ্‌ক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁর শ্রম, অভিজ্ঞতা, পাঠ, সময়কে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানুষের সঙ্গে সংযোগও সেই জীবনের অংশ। হাসান হাফিজের জীবন ও কর্মে এই বহুমাত্রিকতার প্রতিফলন রয়েছে।

 

জন্মদিনে সোনারগাঁওয়ের গর্ব

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের এলাহিনগর থেকে শুরু হওয়া হাসান হাফিজের পথচলা আজ জাতীয় সাহিত্য ও সাংবাদিকতার পরিসরে সুপরিচিত। নিজের জন্মভূমির সঙ্গে তাঁর পরিচয় যেমন অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত, তেমনি তাঁর অর্জনও নারায়ণগঞ্জের সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্য গর্বের বিষয়।

১৫ অক্টোবর তাঁর জন্মদিন শুধু একজন কবির বয়সে আরেকটি বছর যুক্ত হওয়ার দিন নয়; এটি দীর্ঘ সাহিত্যসাধনা, সৃজনশীল শ্রম এবং বহুমাত্রিক অবদানের দিকে ফিরে তাকানোর উপলক্ষ। কবিতা, সাংবাদিকতা ও শিশুসাহিত্যে তাঁর নিরন্তর পথচলা আগামী দিনের পাঠক ও লেখকদের জন্যও প্রেরণার উৎস হয়ে থাকুক—৭১তম জন্মদিনে এ প্রত্যাশাই।

সম্পর্কিত বিষয়: