নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও কর্মচারীর সংকট, অপারেশন থিয়েটারের অচলাবস্থা, ওষুধের স্বল্পতা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিতে এলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
জানা গেছে, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত ৩১ শয্যার রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ২০০৮ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও উপজেলার চার লাখের বেশি মানুষের চিকিৎসা চাহিদা পূরণে হাসপাতালটি এখনও নানা সংকটে জর্জরিত। ফলে উন্নত চিকিৎসার আশায় অনেক রোগীকেই ঢাকামুখী হতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রথম শ্রেণির চিকিৎসকের ৪৩টি পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৩৯ জন। টিএসও, ইএমও এবং গাইনিসহ চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এছাড়া নার্স, মিডওয়াইফ, স্বাস্থ্য সহকারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট, স্ট্রেচার বহনকারী, অফিস সহায়ক ও অন্যান্য মিলিয়ে ২০৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৬০ জন। শূন্য রয়েছে ৪৬টি পদ।
দুটি অপারেশন থিয়েটার থাকলেও একটি দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকা, জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া (জিএ) মেশিন বিকল এবং প্রয়োজনীয় অপারেটর না থাকায় এটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহের কথা থাকলেও অল্প কিছু ওষুধ দেওয়া হয়, বাকি ওষুধ, গজ, ব্যান্ডেজ ও তুলাসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হয়। এছাড়া বাথরুম অপরিচ্ছন্ন, পুরুষ ও নারী রোগীদের একই বাথরুম ব্যবহার করতে হয় এবং হাসপাতালের পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর।
এছাড়া হাসপাতালের একটি পরিত্যক্ত ভবন মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। হাসপাতাল চত্বরে বখাটেদের অবাধ বিচরণ এবং দালাল চক্রের সক্রিয়তায় রোগী ও স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
রোগী রোকন মিয়া, জাহাঙ্গীর মোল্লা ও শামিমা বেগম অভিযোগ করেন, হাসপাতালের প্রবেশমুখেই দালালরা রোগীদের বিভ্রান্ত করে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি নষ্ট বা পরীক্ষার রিপোর্ট ভুল আসে—এমন তথ্য দিয়ে রোগীদের প্রভাবিত করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মারুফ হোসেন বলেন, "অসুস্থ বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। এখানকার বাথরুম এতটাই নোংরা যে সেখানে ঢুকতেই কষ্ট হয়।"
বড়ালু পাড়াগাঁওয়ের হাসিনা বেগম বলেন, "কয়েকদিন ধরে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে আছি। অল্প কিছু ওষুধ দেওয়া হয়েছে, বাকি সব বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।"
স্থানীয় বাসিন্দা মোজাম্মেল হোসেন বলেন, "হাসপাতালের পরিত্যক্ত ভবনে দিন-রাত মাদকসেবীদের আনাগোনা চলে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় রোগী ও স্বজনরা আতঙ্কে থাকেন।"
রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. বাদল কুমার সাহা বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসকসহ মোট ২০৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১৬০ জন। জনবল সংকটের বিষয়টি সিভিল সার্জন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, "দালাল চক্রের বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। তাদের প্রতিরোধে প্রশাসনের সহযোগিতায় আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমরা সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি।"


































