নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে দলবদল, প্রভাব বিস্তার আর কৌশলী অবস্থানের কারণে দীর্ঘ এক যুগ ধরেই আলোচনায় রয়েছেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা ওলামালীগের সহ-সভাপতি মাহাবুব হোসেন মানিক। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যখন দলটির প্রথম সারির প্রায় সব নেতাকর্মী আত্মগোপনে বা মামলার জালে জর্জরিত, তখনো মানিককে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক চালের গুঞ্জন উঠেছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী সূত্রের দাবি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা ও সহিংসতা মামলাগুলো থেকে নিজের নাম বাদ রাখতে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির কতিপয় স্থানীয় নেতাকে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়েছেন তিনি।
গত বছরের (২০২৪) গণ-অভ্যুত্থানের পর নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন থানায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি, তৎকালীন সক্রিয় অনেক নেতার নাম বাদ পড়া বা ছাড় পাওয়ার পেছনে কাজ করছে বিশাল অঙ্কের অর্থ লেনদেন।
স্থানীয় একাধিক রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, মাহাবুব হোসেন মানিক নিজেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলা থেকে দূরে রাখতে অত্যন্ত কৌশলী পথ বেছে নিয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, মামলার এজাহারে নিজের নাম না তোলার জন্য এবং তদন্তে ছাড় পাওয়ার সুবিধার্থে তিনি স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও মধ্যস্থতাকারীকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়েছেন। নাম
প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির তৃণমূলের এক কর্মী বলেন, "বিগত সময়ে যারা মাঠ কাঁপিয়েছিল, এখন অনেকেই টাকার জোরে মামলার তালিকা থেকে পার পেয়ে যাচ্ছে। ওলামালীগ নেতা মানিকের ব্যাপারেও একই গুঞ্জন বাতাসে ভাসছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মানিক দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের একাধিক প্রভাবশালী নেতার ‘গুড বুকে’ ছিলেন।
সূত্রগুলোর দাবি, আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের সঙ্গে মানিকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে দলটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের দফতর পর্যন্ত তাঁর সরাসরি যোগাযোগ ছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলন চলাকালে নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের অনুসারীদের পক্ষে মানিক সরাসরি মাঠে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলনের সময় দলীয় কর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা এবং সমন্বয়ের পেছনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
আওয়ালীগের এই পদধারী নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে অর্থ সংগ্রহ, বণ্টন এবং দলীয় আর্থিক লেনদেনে মধ্যস্থতা করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
মানিকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ এটিই প্রথম নয়। ২০০১ সালে বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় বিএনপি নেতা আলমগীরকে হত্যার ঘটনায় মানিকের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছিল।
অথচ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই মানিকই এখন ভোলবদলের চেষ্টায় লিপ্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, শুধু মামলা থেকে বাঁচাই নয়, বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে তিনি সরকারি দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মাহাবুব হোসেন মানিকের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দাবি করেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি জনসমক্ষে আসছেন না এবং কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সত্য নয়।
অন্যদিকে, বিএনপি নেতাদের অর্থ নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে দলটির নারায়ণগঞ্জ জেলার এক সিনিয়র নেতা বলেন "আমাদের দলে কোনো চাঁদাবাজ বা আওয়ামী লীগের দোসরদের আশ্রয়দাতার ঠাঁই নেই। কেউ যদি মামলার নাম বাদ দেওয়ার নামে অর্থ লেনদেন করে থাকে, তবে তা ব্যক্তিগত দায়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে দলের পক্ষ থেকে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
ওসি মোহাম্মদ এমদাদুল হক বলেন, "বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্ব ও স্বচ্ছতার সাথে করা হচ্ছে। এখানে কোনো অপরাধী বা বিগত আন্দোলনে মাঠপর্যায়ে সহিংসতায় জড়িত কেউ যাতে ছাড় না পায়, সে ব্যাপারে আমাদের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। ওলামালীগ নেতা মাহাবুব হোসেন মানিক বা অন্য কারও মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য আর্থিক লেনদেনের যে গুঞ্জন বা অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মামলার এজাহারে নাম অন্তর্ভুক্তি বা বাদ দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ তথ্য-প্রমাণ এবং তদন্তের ওপর নির্ভরশীল। কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ বা আর্থিক প্রলোভনে পড়ে তদন্ত প্রভাবিত করার সুযোগ নেই।যদি সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনে হামলা বা অর্থায়নের প্রমাণ মেলে, তবে তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেমন হয়রানির শিকার হবেন না, তেমনি অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে পার পেতে দেওয়া হবে না।"


































