নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

বুধবার,

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

নারায়ণগঞ্জে অগ্নিঝুঁকিতে ৮৪ মার্কেট

নুসরাত জাহান সুপ্তি

প্রকাশিত:২০:০৪, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

নারায়ণগঞ্জে অগ্নিঝুঁকিতে ৮৪ মার্কেট

শিল্প সম্মৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ মার্কেটে ও শপিংমলে নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। ফলে ছোট-বড় ৮৪টি মার্কেটকে অগ্নিঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। এ তালিকায় সিটি করপোরেশনের মার্কেটও রয়েছে। এসকল মার্কেট কর্তৃপক্ষকে  জেলা ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্স একাধিকবার সতর্ক করলেও কর্ণপাত করছে না তারা। যার প্রকৃত উদাহরণ নয়ামাটির করিম মার্কেট। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে মার্কেট কর্তৃপক্ষকে কয়েকবার সতর্ক করলেও এখনো কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। নিরাপত্তার বিষয়ে মালিক সমিতি উদাসীন হলেও ক্রেতা-বিক্রেতারা শঙ্কিত ।  


সরেজমিনে নগরের একাধিক মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, ডিআইটি মার্কেটের গলিতে দোকানগুলো এমনভাবে গড়ে উঠেছে যা পরিবেশকে একেবারে ঘিঞ্জি করে তুলেছে। মার্কেটের ভেতরে-বাইরে হাঁটার জায়গাটুকু পর্যন্ত নেই। গা ঘেঁষে পথ চলতে হয় ক্রেতাদের। রিভারভিউ মার্কেট, হাজী করিম উল্লাহ মার্কেট, করিম মার্কেট, বন্দন মার্কেট সহ অধিকাংশ মার্কেটের চিত্র একই। বিশেষ করে পুরনো মার্কেটগুলোর বেশিরভাগেরই অগ্নিনির্বাপণের কোনো রকম ব্যবস্থা নেই। পাশাপাশি অধিকাংশ নতুন মার্কেটের অনেকগুলোতেও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল অক্সিজেন সিলিন্ডার দেখা গেলেও পানির রিজার্ভ ট্যাংক বা আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র দেখা যায় না। যেকোনো মুহূর্তের অগ্নিকাণ্ডে রয়েছে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির আশঙ্কা। 


ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সূত্রমতে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স নারায়ণগঞ্জ জোন- ১ এর আওতাধীন ৮৪টি মার্কেটকে অগ্নি ঝুকিঁপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অগ্নিঝুঁকি চিহ্নিত এসব মার্কেটের অধিকাংশ সিটি করপোরেশনে অবস্থিত। অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে বঙ্গবন্ধু সড়কে অবস্থিত জামান টাওয়ার, জেএম সুপার মার্কেট, জনতা সুপার মার্কেট, গ্রীণ সুপার মার্কেট, ডায়মন্ড সুপার মার্কেট, আজহার সুপার মার্কেট , সোনার বাংলা সমবায় মার্কেট, টেকনো মার্কেট, শরীফ সুপার মার্কেট, গুলশান মার্কেট,ভূইয়া মার্কেট, ডিআইটি মার্কেট, মল্লিক টাওয়ার হাসান প্লাজা, হাজী মোতালেব মার্কেট, হাকিম মার্কেট, গিয়াস সুপার মার্কেট, সুরেশ প্লাজা, টপ মার্ট ফ্যাবিক্স লিঃ নারায়ণগঞ্জ, ইসলাম মার্কেট, ক্লাব মার্কেট, ড. মাহবুব মার্কেট, দেলোয়ার সুপার মার্কেট, জাহান সুপার মার্কেট, নয়ন সুপার মার্কেট, ইব্রাহিম সুপার মার্কেট, আফসানা মার্কেট, শরীফ সুপার মার্কেট, মজিদ সুপার মার্কেট, খাজা সুপার মার্কেট, পানোরোমা প্লাজা সহ চাষাড়ায় রয়েছে বেলী টাওয়ার, মার্ক টাওয়ার ফ্যাশন মার্কেট, সমবায় নিউ মার্কেট, শান্তনা মার্কেট।  সিরাজ উদ দৌল্লা রোডে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ শিপিং কমপ্লেক্স-০১, এন ইসলাম রেলওয়ে মার্কেট, হাজী তারা মিয়া মার্কেট।


এছাড়ও শহরে অগ্নিঝুঁকিতে চিহ্নিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন মার্কেট, দেওভোগের সোহওয়ার্দী মার্কেট,  টানবাজারের রিভারভিউ কমপ্লেক্স , মিনা বাজারের জুয়েলারী মার্কেট, সনাতন পাল লেনের আলমাস আলী সুপার মার্কেট, ফলপট্টি এলাকার হাফিজুল্লাহ মার্কেট। আলী আহম্মদ চুনকা সড়কে অবস্থিত  শেরে বাংলা মার্কেট, রহমতউল্লাহ শপিং কমপ্লেক্স, নিউ জামির সুপার মার্কেট ও ডিআইটি রোড অবস্থিত রিয়াজ সুপার মার্কেট, খান সুপার মার্কেট। এসএম মালেহ রোডের হাবিব শপিং কমপ্লেক্স, রিভারভিউ মার্কেট, থানা পুকুর পাড়ে সন্তষ মার্কেট, আব্দুর রহমান মার্কেট, মসজিদ মার্কেট ও বালুরমাঠের নুর মসজিদ মার্কেট, হাসনাত স্কয়ার মার্কেট, মোবাইল মার্কেট অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।


নয়ামাটির মার্কেটগুলো সর্বাধিক ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানা যায়। এখানের হাজী করিম উল্লাহ মার্কেট, করিম মার্কেট, গিড়িধারা মার্কেট, বন্দন মার্কেট ও গলাচিপা এলাকার জুপিটার মার্কেট, টিপু প্লাজা মার্কেট, পুদ্দার মার্কেট এবং উকিলপাড়ার মিড টাউন শপিং কমপ্লেক্স, বিভার ফ্যাশন, মল্লিক টাওয়ার, মসজিদ মার্কেট, জিয়া মার্কেট চিহ্নিত করা হয়েছে। 


ফতুল্লার বিসিক ,পঞ্চবটি ও পাগলায় একই পরিস্থিতিতে রয়েছে কিছু সংখ্যক মার্কেট। বিসিকের আব্দুর রাজ্জাক প্লাজা, মহিউদ্দিন মার্কেট, আব্দুল লতিফ মার্কেট, রাজা বাদশা মার্কেট, পঞ্চবটির এ রহমান প্লাজা, রফিক মার্কেট, হাজী সোহেল মার্কেট, আকবর টাওয়ার, এস এইচ প্লাজা এবং পাগলা বাজারের সুরুজ মিয়া মার্কেট, আফছার করিম প্লাজা, মসজিদ মার্কেট, কাজী খোরশেদ প্লাজা, বাদশা প্লাজা, আলম ভুইয়া মার্কেট অগ্নিঝুঁকিতে চিহ্নিত। এসকল ঝুকিঁপূর্ণ মার্কেট কর্তৃপক্ষকে নোটিশ করা হলেও প্রতিকারের কোন উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের।
 
 
নারায়ণগঞ্জ ফায়ারসার্ভিস কর্তৃক জানা যায়, অগ্নিঝুঁকি প্রতিরোধে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ও অগ্নি আইন (২০০৩) অনুযায়ী ভবন নির্মাণে ৩০টির বেশি নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এসব নিয়ম না মেনেই চলছে মার্কেটের সার্বিক কার্যক্রম। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী দূর্ঘটনা রোধে মার্কেটের অবস্থান, ব্যবহৃত ফেøারের আয়তন, সাধারণ সিঁড়ির প্রশস্ততা, অগ্নিনির্বাপণ কাজে সিঁড়ির ব্যবস্থা, জরুরী প্রস্থানের সিঁড়ির সংখ্যা, প্রতি তলায় সেফটি লবির ব্যবস্থা রাখতে হবে। সেই সাথে ছাদে ওঠার সিঁড়ির সংখ্যা বেশি থাকা, ছাদের দরজা খোলা রাখা, বহির্গমন দরজার সংখ্যা বেশি রাখা, আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভ ট্যাংক মজুদ (৫০ হাজার গ্যালন) রাখা, ১০ হাজার গ্যালনের ওভার হ্যাড ওয়াটার ট্যাংক থাকা বাধ্যতামূলক। একই সাথে বৈদ্যুতিক তারে কনসিল ওয়্যারিং থাকা, বৈদ্যুতিক মেইন সুইচ বক্স ও ডিমান্ড বক্সের নিরাপদ অবস্থানে থাকা এবং প্রতি পয়েন্টে পাঁচ কেজি পরিমাণের সিওটু ফায়ার এক্সটিংগুইসার সংরক্ষণ করা, স্মোক ও হিট ডিটেক্টর রাখা এবং মার্কেটের ব্যবসায়ী ও কর্মীদের নিয়মিত অগ্নি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রশিক্ষণ করানোর কথা থাকলেও এসব নিয়ম কেউই মানছে না। পাশাপাশি আধুনিক ভবনগুলোতে উন্নত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি স্মোক ডিটেক্টর, অটোমেটিক ফায়ার ডিটেক্টর ইত্যাদি ব্যবহার করার ব্যবস্থা রাখার কথা থাকলেও সবাই তা মানছে না। এমনকি ওসব ভবনগুলোতে অগ্নিনির্বাপক যে যন্ত্র রয়েছে সেগুলোও মেয়াদোত্তীর্ণ। এছাড়া মার্কেটের ট্রান্সফরমার, জেনারেটর, বিদ্যুতের সাব-স্টেশন সব একই জায়গায় স্থাপিত। 
 


এদিকে নারায়ণগঞ্জ মার্কেট সমিতির সভাপতি মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, নারায়ণগঞ্জের একাধিক মার্কেট অনেক পুরোনো। যে সময়ে মার্কেট নির্মাণ হয়েছে তখন যেসব নিয়ম মেনে কাজ করা দরকার ছিল, সেই নিয়ম মেনেই মার্কেট তৈরী করা হয়েছিল। তখন অগ্নিঝুঁকি সংক্রান্ত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে তখন জানানো হয়নি। তবে আমরা নিজস্ব উদ্যোগে মার্কেটে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র লাগানোর নির্দেশনা দিয়েছি। তবে নতুন মার্কেট নির্মাণে বর্তমান সকল নিয়ম মেনে ভবন তৈরীর নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে জেলার ৮৪ টি মার্কেট অগ্নিঝুঁকির আওতায় এ বিষয়ে আমার জানা ছিল না। এ সংক্রান্ত কোন নোটিশ আমরা পাইনি। 


নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন এ বিষয়ে বলেন, আমরা নিয়মিত বিভিন্ন  মার্কেট পরিদর্শন করে কোনটি ঝুঁিকপূর্ণ চিহ্নিত করছি। আমরা শীগ্রই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ওয়েব সাইটে সকল ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট গুলোর নাম প্রকাশ করব এবং মার্কেট কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হবে। তখন সকল দপ্তর আমাদের ওয়েবসাইট থেকে এসব ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অবগত থাকবে। আমাদের নোটিশের পরেও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে দায়িত্ব অবহেলা করলে এবং কোন বড় ধরনের দূর্ঘটনা হলে দায়ভার তাদের নিজেদের হবে।  

সম্পর্কিত বিষয়: