নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

মঙ্গলবার,

০৭ জুলাই ২০২৬

জরায়ুতে ফাইব্রয়েড টিউমার: কারণ, লক্ষণ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

ডা. গাজী খায়রুজ্জামান:

প্রকাশিত:১৭:৩৫, ৭ জুলাই ২০২৬

জরায়ুতে ফাইব্রয়েড টিউমার: কারণ, লক্ষণ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

জরায়ুর ফাইব্রয়েড (Uterine Fibroid) হলো জরায়ুর পেশী ও তন্তুযুক্ত কলা থেকে তৈরি হওয়া এক ধরনের অক্যান্সারজনিত (Benign) টিউমার। এটি মায়োমা (Myoma) বা লিওমায়োমা (Leiomyoma) বা ফাইব্রোমায়োমা (Fibromyoma) বা জরায়ুর ফাইব্রয়েড টিউমার নামেও পরিচিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড (Uterine Fibroid) বা লিওমায়োমা (Leiomyoma) বা মায়োমা (Myoma) বা ফাইব্রোমায়োমা (Fibromyoma) বলা হয়।

যদিও "টিউমার" শব্দটি অনেকের মধ্যে ভয়-ভীতির সৃষ্টি করে, বাস্তবে জরায়ুর ফাইব্রয়েড থেকে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা নাই বললেই চলে এবং অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ সৃষ্টি করে না।

সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ইউটেরাইন ফাইব্রয়েড বেশি দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান ধারণের উপযোগী বয়সী নারীদের একটি বড় অংশ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ইউটেরাইন ফাইব্রয়েডে আক্রান্ত হতে পারেন। অনেকেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা পর্যন্ত এ সম্পর্কে জানতেও পারেন না।

কেন ফাইব্রয়েড হয়?

ফাইব্রয়েডের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী হরমোন ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন ফাইব্রয়েডের বৃদ্ধি ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া বংশগত কারণ, অতিরিক্ত ওজন, ভিটামিন-ডি-এর ঘাটতি, সন্তান না হওয়া বা দেরিতে সন্তান ধারণ এবং কিছু জীবনযাপনগত কারণ, ফাইব্রয়েডের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ফাইব্রয়েডের ধরণ:

জরায়ুর অবস্থান অনুযায়ী ফাইব্রয়েডকে প্রধানত চার ভাগে ভাগ করা হয়—

১. ইন্ট্রামুরাল ফাইব্রয়েড (Intramural Fibroid): এটি জরায়ুর পেশীর ভেতরে তৈরি হয় এবং এই ধরনের ফাইব্রয়েড সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

২. সাবমিউকোসাল ফাইব্রয়েড (Submucosal Fibroid): এটি জরায়ুর অভ্যন্তরীণ আবরণের নিচে বৃদ্ধি পায়। এ ধরনের ফাইব্রয়েড অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও গর্ভধারণে মারাত্মক সমস্যার কারণ হতে পারে।

৩. সাবসেরোসাল ফাইব্রয়েড (Subserosal Fibroid): এটি জরায়ুর বাইরের অংশে বৃদ্ধি পায় এবং আকার বড় হলে আশপাশের অঙ্গে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

৪. পেডাঙ্কুলেটেড ফাইব্রয়েড (Pedunculated Fibroid): এটি ডাঁটার মতো অংশের মাধ্যমে জরায়ুর সঙ্গে যুক্ত থাকে। কখনো ডাঁটা মোচড় বা চাপ খেলে তীব্র ব্যথা হতে পারে।

কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

অনেক ফাইব্রয়েডে কোনো উপসর্গ থাকে না। তবে আকার ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে নিচের সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে—

অতিরিক্ত বা দীর্ঘদিন মাসিক রক্তক্ষরণ, মাসিকের সময় তীব্র ব্যথা, মাসিকের মাঝখানে রক্তপাত, তলপেটে চাপ, ভারী ভাব বা ব্যথা, কোমর বা পিঠে ব্যথা, সহবাসের সময় ব্যথা, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ বা প্রস্রাব সম্পূর্ণ না হওয়ার অনুভূতি, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট স্বাভাবিকের তুলনায় বড় দেখানো, গর্ভধারণে সমস্যা বা বারবার গর্ভপাত, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া)।

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে ফাইব্রয়েড নির্ণয় করা হয়। সাধারণত নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো করা হতে পারে—

পেলভিক পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাফি (USG), এমআরআই (MRI), বিশেষ প্রয়োজনে অন্যান্য ইমেজিং পরীক্ষা।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা:

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় রোগীর সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ বিবেচনা করে ওষুধ নির্বাচন করা হয়। রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী Calcarea Carbonica, Thuja Occidentalis, Fraxinus Americana, Sabina, Sepia, Hamamelis, Trillium Pendulum, Pulsatilla, Conium এবং Calcarea Fluorica-সহ বিভিন্ন ওষুধ অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক বিবেচনা করতে পারেন। তবে এই ওষুধগুলো শুধুমাত্র অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত গ্রহণ করবেন না। কারণ রোগীর শারীরিক, মানসিক ও রোগের উপর ভিত্তি করে সঠিক ঔষধ নির্বাচন না করলে কোন ধরনের ফল পাবেন না। একমাত্র একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকই সঠিক ওষুধ ও ডোজ এবং কোন ঔষধটি আপনার জন্য অত্যন্ত কার্যকরী তা নির্বাচন করতে পারবেন ।

চিকিৎসা সংক্রান্ত সতর্কতা:

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় সঠিক ওষুধ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী ওষুধ ভিন্ন হতে পারে। তাই অবশ্যই অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করা উচিত। নিজে নিজে ওষুধ গ্রহণ না করে নিবন্ধিত ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সচেতন থাকুন:

অতিরিক্ত মাসিক রক্তক্ষরণ, দীর্ঘদিন তলপেটে ব্যথা, দ্রুত পেট বড় হয়ে যাওয়া, গর্ভধারণে সমস্যা বা রক্তস্বল্পতার লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। সময় মত রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে জরায়ুর ফাইব্রয়েড সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ ও আরোগ্য করা সম্ভব এবং রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরতে পারেন।

লেখক:

ডা. গাজী খায়রুজ্জামান

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যবিষয়ক কলামিস্ট।

মোবাইল: ০১৭৪৩৮৩৪৮১৬

সম্পর্কিত বিষয়: