নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

বুধবার,

১০ জুন ২০২৬

স্মার্টবোর্ড: শিক্ষার্থীর  মনোযোগ বৃদ্ধির অন্যতম হাতিয়ার

ড. মো: বিল্লাল হোসেন:

প্রকাশিত:১৮:১৩, ৯ জুন ২০২৬

স্মার্টবোর্ড: শিক্ষার্থীর  মনোযোগ বৃদ্ধির অন্যতম হাতিয়ার

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা শিক্ষা ব্যবস্থাকেও নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একসময় যে শ্রেণিকক্ষ ছিল কেবল ব্ল্যাকবোর্ড, চক ও বইনির্ভর—আজ তা রূপান্তরিত হয়েছে ডিজিটাল, ইন্টারেক্টিভ ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক পরিবেশে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে স্মার্ট বোর্ড,যা শুধুই একটি প্রযুক্তি নয়, বরং শিক্ষার এক নতুন বিপ্লব। স্মার্ট বোর্ড বা ইন্টারেক্টিভ হোয়াইটবোর্ড হলো এমন একটি ডিজিটাল টুল, যা কম্পিউটার, ইন্টারনেট এবং মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির সমন্বয়ে শ্রেণিকক্ষকে করে তোলে জীবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই সরাসরি বোর্ডে স্পর্শ করে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, লিখতে পারে, ভিডিও দেখতে পারে, এমনকি তা সংরক্ষণও করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্ট বোর্ড শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ ও প্রেরণা বৃদ্ধি করে এবং পাঠদানকে আরও কার্যকর করে তোলে।

আজকের শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল পরিবেশে বেড়ে উঠছে। ফলে তারা দৃশ্যমান, অডিও ও ইন্টারেক্টিভ শিক্ষায় বেশি সাড়া দেয়। স্মার্ট বোর্ড এই তিনটি উপাদানকে একত্র করে শেখাকে আকর্ষণীয় করে তোলে। একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, স্মার্ট বোর্ড ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের engagement বা অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, কারণ তারা সরাসরি শেখার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারে। অন্যদিকে, মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার, ভিডিও, অ্যানিমেশন, গ্রাফিক্স, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করে। স্মার্ট বোর্ডের একটি বড় সুবিধা হলো—পাঠ সংরক্ষণ ও পুনরায় ব্যবহার। শিক্ষক সহজেই ক্লাসের নোট, ব্যাখ্যা বা উপস্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করে পরে আবার ব্যবহার করতে পারেন।এই সুবিধার কারণে শিক্ষার্থীরা অনুপস্থিত থাকলেও পরে সহজে পাঠ বুঝে নিতে পারে, যা শেখার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

প্রতিটি শিক্ষার্থীর শেখার ধরন আলাদা—কেউ দেখে শেখে, কেউ শুনে, আবার কেউ হাতে-কলমে। স্মার্ট বোর্ড এই তিন ধরনের শিক্ষার্থীকেই সমানভাবে সহায়তা করে। একই প্ল্যাটফর্মে ছবি, শব্দ, স্পর্শ, সবকিছুর সমন্বয় শিক্ষার্থীদের বোঝার ক্ষমতা ও স্মৃতিধারণ ক্ষমতা বাড়ায়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে স্মার্ট বোর্ড এখন আর বিলাসিতা নয় এটি প্রয়োজনীয়তা। যুক্তরাজ্যে ২০০৯ সালেই প্রায় ২,৮৩,০০০ শ্রেণিকক্ষে স্মার্ট বোর্ড ব্যবহৃত হয়েছে, যা মোট শ্রেণিকক্ষের প্রায় ৭৩%। ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশে এই প্রযুক্তি দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।

স্মার্ট বোর্ড শুধু আকর্ষণীয়তা বাড়ায় না, বরং শিক্ষার ফলাফলও উন্নত করে। গবেষণা বলছে স্মার্ট বোর্ড ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। এছাড়া, এটি শিক্ষককে আরও সৃজনশীল ও পরিকল্পিতভাবে পাঠদান করতে সহায়তা করে। শিক্ষক সহজেই বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য নিয়ে পাঠকে সমৃদ্ধ করতে পারেন। বিশেষ করে গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ভীতি কাজ করে, স্মার্ট বোর্ড তা কমাতে সহায়ক। চিত্র, অ্যানিমেশন ও লাইভ সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে কঠিন বিষয়গুলো সহজ হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থীরা ভয় নয়, বরং আগ্রহ ও আনন্দ নিয়ে শিখতে শুরু করে—যা গুণগত শিক্ষার মূল লক্ষ্য।

স্মার্ট বোর্ড শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিগত যন্ত্র নয়; এটি শিক্ষা পদ্ধতির একটি মৌলিক পরিবর্তন। এটি শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষায় রূপান্তর ঘটায়। বর্তমান বিশ্বে যেখানে দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান অপরিহার্য—সেখানে স্মার্ট বোর্ড শিক্ষার্থীদের সেই প্রস্তুতি গ্রহণে সহায়তা করে। স্মার্ট বোর্ড আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় এক অনন্য সংযোজন, যা শেখাকে করেছে সহজ, আনন্দময় ও কার্যকর। এটি শিক্ষার্থীদের মনোযোগী করে, অংশগ্রহণ বাড়ায়, পুনরাবৃত্তিকে সহজ করে এবং শিক্ষাকে জীবন্ত করে তোলে। আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে—নিশ্চয়ই গুণগত শিক্ষার পথে আমরা আরও একধাপ এগিয়ে যেতে পারব। স্মার্ট বোর্ড কেবল একটি বোর্ড নয়—এটি আগামী প্রজন্ম গড়ার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।


লেখক:

ড. মো: বিল্লাল হোসেন                        
উপাধ্যক্ষ                                         
মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ   
কাঁচপুর, সোনারগাঁও, নারায়নগঞ্জ