নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

সোমবার,

২২ জুন ২০২৬

বাজেট, পে-স্কেল এবং বেসরকারি সেক্টর: সমন্বিত বেতন নীতির গুরুত্ব

ড. মো: বিল্লাল হোসেন:

প্রকাশিত:২১:৩৩, ২২ জুন ২০২৬

বাজেট, পে-স্কেল এবং বেসরকারি সেক্টর: সমন্বিত বেতন নীতির গুরুত্ব

প্রতিবছরের জাতীয় বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং সামাজিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। বাজেটে যখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বা বেতন বৃদ্ধি ঘোষণা করা হয়, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। কিন্তু একই সময়ে দেশের বিশাল বেসরকারি খাতে কর্মরত কোটি মানুষের বেতন কাঠামো যদি অপরিবর্তিত থাকে, তবে অর্থনীতিতে একটি ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি দেখা দেয়। তাই বাজেট প্রণয়নের সময় সরকারি পে স্কেলের পাশাপাশি বেসরকারি সেক্টরের জন্যও একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশনা থাকা সময়ের দাবি। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ এই খাতেই সৃষ্টি হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবহন, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প—সবখানেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অপরিসীম। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয় এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এই খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনীতির একটি মৌলিক তত্ত্ব হলো Efficiency Wage Theory, যেখানে বলা হয় যে ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক বেতন- কর্মীদের উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য বৃদ্ধি করে। আবার Human Capital Theory অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তির উন্নয়নে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। কিন্তু যদি সরকারি চাকরিতে বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বেসরকারি খাতে তার কোনো প্রতিফলন না ঘটে, তাহলে দক্ষ কর্মীরা সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকবে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মেধা ধরে রাখা কঠিন হবে এবং উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি সাধারণত বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায়। যদি বেসরকারি খাতের কর্মীরা একই সময়ে বেতন বৃদ্ধি না পান, তাহলে তারা বাস্তবে আয় হ্রাসের শিকার হন। অর্থাৎ কাগজে-কলমে বেতন অপরিবর্তিত থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের প্রকৃত আয় কমে যায়। এর ফলে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক অসন্তোষের সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
বাজেটে তাই এমন একটি নীতিগত কাঠামো থাকা উচিত, যেখানে সরকারি পে-স্কেল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি খাতের জন্যও কিছু নির্দেশনামূলক ব্যবস্থা থাকবে। এর অর্থ এই নয় যে সরকার সরাসরি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন নির্ধারণ করবে। বরং সরকার একটি ন্যূনতম বেতন সমন্বয় সূচক, মূল্যস্ফীতি-ভিত্তিক বার্ষিক বেতন পর্যালোচনা এবং খাতভিত্তিক বেতন নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশেই সরকার শ্রমবাজারের ভারসাম্য রক্ষায় নিয়মিত ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনা, জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা এবং সামাজিক সংলাপের মাধ্যমে বেতন সমন্বয়ের নীতি অনুসরণ করে। এতে শ্রমিকের কল্যাণ যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি ব্যবসায়িক পরিবেশও স্থিতিশীল থাকে। বাংলাদেশেও সরকার, নিয়োগকর্তা ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী জাতীয় বেতন পর্যালোচনা কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যা প্রতি দুই বা তিন বছর পরপর বেসরকারি খাতের বেতন কাঠামো মূল্যায়ন করবে।
অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমান সক্ষম নয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নীতিমালার সঙ্গে কর রেয়াত, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি কর্মসূচি, প্রযুক্তি সহায়তা এবং স্বল্পসুদে অর্থায়নের মতো প্রণোদনা যুক্ত করা যেতে পারে। অর্থাৎ বেতন বৃদ্ধি হবে বাস্তবসম্মত, ধাপে ধাপে এবং প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। হাজার হাজার শিক্ষক, চিকিৎসক ও পেশাজীবী দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম বেতনে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি পে-স্কেল বাড়লেও তাদের বেতন একই অবস্থায় থেকে গেলে দক্ষ জনবল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে সেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বাজেটে এসব খাতের জন্য বিশেষ নীতিগত সহায়তা থাকা প্রয়োজন।
একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের উন্নত বেতন যেমন প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি করে, তেমনি বেসরকারি খাতের ন্যায্য বেতন উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ভোক্তা ব্যয়কে শক্তিশালী করে। এই দুইয়ের সমন্বয়ই টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। সবশেষে বলা যায়, জাতীয় বাজেট তখনই সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, যখন তা কেবল সরকারি কর্মচারীদের নয়, দেশের বৃহত্তর কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর স্বার্থও সমানভাবে বিবেচনা করবে। সরকারি পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি সেক্টরের জন্য সুস্পষ্ট বেতন-নীতিমালা, মূল্যস্ফীতি-সমন্বিত নির্দেশনা এবং বাস্তবায়নযোগ্য কাঠামো প্রণয়ন করা হলে অর্থনীতিতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে, দক্ষ জনশক্তি সংরক্ষিত হবে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার আরও সুদৃঢ় হবে। একটি উন্নত ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের পথে এটিই হতে পারে অন্যতম কার্যকর পদক্ষেপ।

ড. মো: বিল্লাল হোসেন
উপাধ্যক্ষ
মোশাররফ হোসেন স্কুর অ্যান্ড কলেজ
কাঁচপুর, সোনারগাঁও,নারায়নগঞ্জ

সম্পর্কিত বিষয়: