নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে মহানগর ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত মাহবুব হোসেন মানিকের বিরুদ্ধে পাওনাদারের টাকা পরিশোধ না করা, জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় তিনি এলাকায় নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মানিকের পৈতৃক বাড়ি সিদ্ধিরগঞ্জের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মিজমিজি এলাকায়। বর্তমানে তিনি হিরাঝিল এলাকায় বসবাস করছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, পাওনাদারদের টাকা ফেরত না দিয়ে উল্টো হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। এ নিয়ে ভুক্তভোগীদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন মানিক। তাঁর রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সঙ্গে ছবি তুলে সেটিকে পুঁজি করে এলাকায় নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন মানিক। বিভিন্ন সময় তিনি শামীম ওসমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা প্রচার করে বেড়াতেন। তাঁর বিরুদ্ধে কেউ অবস্থান নিলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হয়রানি করার ভয় দেখাতেন বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করে টাকা আদায়ের অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমি বিক্রির পরও বিভিন্ন অজুহাতে নতুন করে বিরোধ সৃষ্টি করতেন মানিক। কখনো জমিতে ওয়ারিশ থাকার কথা, আবার কখনো পরিমাণের চেয়ে বেশি জমি দখলে থাকার অভিযোগ তুলে জমি ছাড়ার চাপ দিতেন। এসব অজুহাতে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
৫ আগস্টের পর আত্মগোপন, পরে এলাকায় ফেরার অভিযোগ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন মানিক। এ সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনসংক্রান্ত মামলায় নিজের নাম আসা ঠেকাতে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পরবর্তী সময়ে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে সখ্য গড়ে আবারও এলাকায় সক্রিয় হন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাঁদের দাবি, একদিকে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছেন, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের সঙ্গেও গোপনে যোগাযোগ রাখছেন মানিক।
পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের দাবি, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমানসহ পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে মানিকের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। মজিবুর রহমানের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদ দেখাশোনার দায়িত্বও তিনি পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের আরও দাবি, মানিক একাধিক মোবাইল সিম ব্যবহার করেন এবং প্রশাসনের নজর এড়াতে দিনের বেলায় চলাফেরা কমিয়ে রাতের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকেন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক সোর্সের মাধ্যমে এলাকার খোঁজখবর রাখার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, তাঁকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তাঁর যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য তদন্ত করা হলে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, মানিকের খুঁটির জোর কোথায়?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক প্রভাবশালী নেতা আত্মগোপনে গেলেও মানিক কীভাবে এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন, কারা তাঁকে সহযোগিতা করছেন এবং কীভাবে তিনি বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছেন—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাঁদের দাবি, মানিক বিভিন্ন সময় হুমকি দিয়ে বলেছেন, ডিসেম্বর মাসে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে তিনি দেখে নেবেন। তবে এ বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগীদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও মানিকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত না হলে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হতে পারেন।
পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপ কামনা
ভুক্তভোগীরা মাহবুব হোসেন মানিকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই, পাওনাদারদের অর্থ ফেরত এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে হয়রানির অভিযোগ তদন্তে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাহবুব হোসেন মানিকের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।


































