পাসপোর্ট করতে এখন দালালের প্রয়োজন নেই—এমন বার্তাই দেওয়া হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে। আবেদনকারীরা নিজেরাই আবেদন জমা দিচ্ছেন। সরকারি নির্ধারিত ফি ছাড়া অতিরিক্ত কোনো অর্থ দিতে হচ্ছে না। অফিসের বিভিন্ন কক্ষে সিসিটিভির মাধ্যমে নজরদারি, ডিজিটাল ডিসপ্লেতে তথ্য প্রচার এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, নারায়ণগঞ্জে সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
অফিসের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে ভেতরের বিভিন্ন স্থানে পাসপোর্ট আবেদনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আবেদন প্রক্রিয়া ও করণীয় সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হচ্ছে। দালালের মাধ্যমে কাজ না করে সরাসরি অফিসে এসে নিজের পাসপোর্ট নিজে করার জন্যও সেবাগ্রহীতাদের আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এসব বিষয়ে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস নারায়ণগঞ্জের সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে কথা হয় উপপরিচালক আবু নাঈম মাসুমের সঙ্গে।
তিনি জানান, বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দালালের কোনো দৌরাত্ম্য নেই। তিনি নিয়মিত অফিসের কার্যক্রম তদারক করছেন। সিসিটিভির মাধ্যমে অফিসের বিভিন্ন কক্ষের কার্যক্রমও সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে তা প্রতিবেদককে দেখান তিনি।
সেইসাথে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ ও তথ্য জানার জন্য তার কক্ষ সার্বক্ষণিক খোলা রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত ওই কক্ষে গিয়ে সরাসরি অভিযোগ জানাতে বা পাসপোর্ট-সংক্রান্ত তথ্য জানতে পারছেন সেবাগ্রহীতারা।
এছাড়াও পাসপোর্ট অফিসের নিরাপত্তায় চারজন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। প্রয়োজন ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে অফিসের ভেতরে অবস্থান করতে দেওয়া হচ্ছে না এমনকি ঢুকতেও দিচ্ছে না তারা।
উপপরিচালক আবু নাঈম মাসুম বলেন, ‘প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন শেষ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কমেছে। মানুষের ভোগান্তি লাঘব হয়ে আস্থা ফিরেছে। পাসপোর্টের সেবা নিতে সরকারি ফি ছাড়া কাউকে কোনো টাকা দিতে হয় না বলেও জানান তিনি।
অফিসের প্রধান ফটকের সামনে খালি জায়গায় বসানো হয়েছে সাউন্ড বক্স। সেখানে সার্বক্ষণিক প্রচার করা হচ্ছে, দালালের খপ্পরে না পড়ে সরাসরি অফিসে এসে পাসপোর্ট করার জন্য।
পাসপোর্ট করতে কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন, কীভাবে আবেদন করতে হবে এবং আবেদনকারীর করণীয় কী—এসব তথ্যও মাইকের মাধ্যমে জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি একটি বড় এলইডি ডিসপ্লেতে দিন-রাত বিভিন্ন নির্দেশনা প্রচার করা হচ্ছে।
অফিস কর্তৃপক্ষ জানায়, কম্পিউটারের দোকান থেকে অনলাইনে আবেদন করে আবেদনকারী নিজেই ব্যাংকে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে আবেদনের কপি নিয়ে অফিসে আসতে পারেন। কোনো আবেদনে ভুলত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সেইসাথে আবেদনকারী নির্ধারিত ফি ব্যাংকে জমা দিয়ে আবেদনের কপি কাউন্টারে জমা দেওয়ার পর ছবি, আইরিস ও আঙুলের ছাপ দেওয়ার জন্য ডাকা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আবেদন জমা দেওয়ার প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই বায়োমেট্রিকের জন্য ডাকা হয়।
পাসপোর্টের আবেদন নিয়ে আসা সাকিব মাহবুব বলেন, তিনি কম্পিউটারের দোকান থেকে আবেদন করে নিজেই অফিসে এসে আবেদন জমা দিয়েছেন। কোনো দালালের সহযোগিতা নিতে হয়নি বা কোনো ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি।
তিনি আরো বলেন, দীর্ঘদিন মানুষের কাছে পাসপোর্ট অফিসের অনিয়ম সম্পর্কে নানা কিছু শুনে এসেছি তবে এখানে এসে তা আর মনে হলো না।
আরেক সেবাগ্রহীতা মুনতাসীর মাহমুদ বলেন, এর আগেও তিনি এই অফিস থেকে সেবা নিয়েছেন। তবে এবার এসে পরিবেশে পরিবর্তন দেখেছেন। কোনো ধরনের ভোগান্তি ছাড়াই আবেদন জমা দিতে পেরেছেন বলে জানান তিনি।
পাসপোর্ট নিতে আসা নুরুন্নাহার জানান, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যাবেন, পাসপোর্টের আবেদন শেষে নির্ধারিত সময়ের আগেই পাসপোর্ট পেয়েছেন।
এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে পাসপোর্ট অফিসে ‘গোপন কোডিং’ নিয়ে বিভিন্ন প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে উপপরিচালক আবু নাঈম মাসুম বলেন, প্রত্যেক আবেদনকারীর ই-মেইল ঠিকানা দরকার হয় আবেদনের জন্য। যা তারা নিজেরাই আবেদন করে নিজেদের মতো ই-মেইলের নাম নিয়ে আসছে। ফলে সবার ই-মেইল ঠিকানা এক হয় না। প্রত্যেক আবেদনকারীর ই-মেইল ঠিকানা আলাদা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এই ভিন্নতাকেই ‘গোপন কোডিং’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। যা একধরণের অপপ্রচার।
সেইসাথে অফিসে দালালের দৌরাত্ম্য না থাকলেও বিভিন্ন সময় সাংবাদিক পরিচয়ে কিছু ব্যক্তি প্রবেশ করে দালালি করার চেষ্টা করছেন বলে দাবি করেছেন উপপরিচালক।
এ বিষয়ে তিনি ভিডিওসহ কিছু নথি দেখান। তার দাবি, বিভিন্ন পরিচয়ে অফিসে দালালি করার চেষ্টা করা হয়। এসব বিষয়ে অফিস কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে।
সাধারণ মানুষকে দালালের বিষয়ে সচেতন করতে জেলার বিভিন্ন মসজিদেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। উপপরিচালক জানান, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে গত ২ অক্টোবর জেলার বিভিন্ন মসজিদে জুমার নামাজের খুতবায় ইমামদের মাধ্যমে দালাল ছাড়া পাসপোর্ট করার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা হয়েছে।
প্রধান ফটকে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিপাহী মাসুদ খান বলেন, আবেদনকারী বা তার সঙ্গে থাকা নিজস্ব ব্যক্তি এবং তথ্য জানতে আসা ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। অপ্রয়োজনে কাউকে ভেতরে অবস্থান করতে দেওয়া হয় না।
উপপরিচালক আবু নাঈম মাসুমের দাবি, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর নিয়মিত তদারকি, সিসিটিভি মনিটরিং, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দালাল ঠেকাতে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে অফিসে শৃঙ্খলা ফিরেছে। সাধারণ মানুষ সচেতন হয়ে সরাসরি অফিসে এসে সেবা নিলে দালালের প্রয়োজন হবে না বলেও জানান তিনি। সরকারি ফি এর বাইরে কোনো অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের বিষয়টি নিয়েও সবাইকে নিরুৎসাহিত করেন তিনি।


































