২৫ বছর মেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা-২০২৫ (ইপিএসএমপি ২০২৫) অনুমোদনের উদ্যোগকে জনস্বার্থবিরোধী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজ। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি খাতকে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর ‘গ্রিন গ্রিড’-এ রূপান্তরের আহ্বান জানানো হয়েছে।
গতকা বুধবার নারায়ণগঞ্জে আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে বক্তারা এসব দাবি জানান। কর্মসূচিটির আয়োজন করে বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)।
সহ-আয়োজক ছিল পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি (ইএসএডিএস) ও উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন)। এতে পরিবেশবিদ, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী ও স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, দেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাপরিকল্পনা জনগণকে পাশ কাটিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬–২০৫০) প্রণয়নে কোনো গণতান্ত্রিক বা অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
জনশুনানি, উন্মুক্ত আলোচনা কিংবা স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অর্থবহ নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মো. হোসেন বলেন, ‘জ্বালানি পরিকল্পনা কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। অথচ জনগণকে বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
বক্তারা আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল নিয়মিত রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা। কিন্তু তারা সেই সীমা অতিক্রম করে ২৫ বছর মেয়াদি একটি জ্বালানি মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে চাইছে, যা ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। এতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মহাপরিকল্পনায় ‘এনার্জি ট্রানজিশন’-এর কথা বলা হলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই বলে অভিযোগ ওঠে। পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ কাগজে দেখানো হয়েছে ৪৪ শতাংশ, কিন্তু কার্যকর নবায়নযোগ্য জ্বালানি মাত্র ১৭ শতাংশ। বিপরীতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৫ দশমিক ৮ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৫ দশমিক ২ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বক্তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি, কয়লা ও তেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বজায় থাকলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার কারণে বিদ্যুৎ খাত আরও ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
কর্মসূচিতে হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া কো-ফায়ারিং ও কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ (সিসিএস)-এর মতো ব্যয়বহুল ও পরীক্ষামূলক প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিরুদ্ধেও সতর্ক করা হয়। বক্তারা বলেন, এসব প্রযুক্তি এখনো উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতায় অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর নয়।
তাঁরা জানান, প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণ প্রায় ১৮৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন ঈঙ₂ব-এ পৌঁছাতে পারে, যা দেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) ও জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এটি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত ‘শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন’ দর্শনের সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তাঁরা।
এ ছাড়া মহাপরিকল্পনায় শ্রমিক পুনর্বাসন, নারী ও লিঙ্গভিত্তিক ন্যায্যতা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পোশাক খাতের সবুজায়নের মতো সামাজিক বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকার অভিযোগ তোলা হয়।
কর্মসূচি থেকে অবিলম্বে ইপিএসএমপি ২০২৫ স্থগিত ও বাতিলের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে একটি স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরুর আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে বাস্তবসম্মত শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর গ্রিন গ্রিডের রোডম্যাপ প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।


































