নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

শুক্রবার,

১৭ জুলাই ২০২৬

হাতেম ওসমানদের ‘ক্যাশিয়ার’, সেলিম ওসমান সন্ত্রাসী: এমপি আল আমিন

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:২৩:০১, ১৬ জুলাই ২০২৬

হাতেম ওসমানদের ‘ক্যাশিয়ার’, সেলিম ওসমান সন্ত্রাসী: এমপি আল আমিন

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল আমিন বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্ত যথাযথভাবে সম্পন্ন করে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।

 

 বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

আল আমিন বলেন, অনেকে বলেন প্রশাসন আসামিদের খুঁজে পাচ্ছে না। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। নিরীহ কাউকে হয়রানি করা যেমন উচিত নয়, তেমনি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কাউকেই আইনের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত নয়।

 

এসময় তিনি ব্যবসায়ী সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমকে ওসমানদের ‘ক্যাশিয়ার’ আখ্যা দিয়ে বলেন, যারা শেখ হাসিনার সামনে দাঁড়িয়ে জুলাইকে তাণ্ডব বলেছে, এখন ব্যবসায়ী নেতা বলে হাতেমদের নাম বলা যাবে না? অথচ তারাও জুলাই হত্যা মামলার আসামি। এবং হাতেমের বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে। আমি কখনো কোনো দলের বিরুদ্ধে বলি না। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তারা এই নারায়ণগঞ্জটাকে টিকিয়ে রাখছে এবং নারায়ণগঞ্জকে বিদেশে সম্মানিত করেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে কোনো ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আঁতাত করেনি।

 

সেলিম ওসমান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেলিম ওসমানও ব্যবসায়ী, সে তো সন্ত্রাসী। ফ্যাসিস্টরা অবশ্যই ফ্যাসিস্ট। এই ধরনের বিভাজন করে বলা যাবে না— এরা ভালো, এরা খারাপ। যারা অপরাধ করেছে, তারাই ফ্যাসিস্ট। যখন নারায়ণগঞ্জে আদিলকে গুলি করে হত্যা করা হয়, এরপর শেখ হাসিনার সামনে দাঁড়িয়ে নারায়ণগঞ্জের যে বলছে, ‘এই জুলাই আন্দোলন যারা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন’, সে এখন ব্যবসায়ী নেতা বলে তাকে স্থান দিতে হবে? এই ধরনের বাংলাদেশ দেখার জন্য আমাদের মায়েদের সন্তানেরা জীবন দেয়নি।

 

আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, আমাদের এখানে বসার কথা ছিল না। টিপু কাকা ছিলেন দৌড়ের ওপর, মইনুদ্দিন আঙ্কেল ওপেন হার্ট সার্জারির রোগী হয়েও কারাগারে ছিলেন। তরিকুল সুজন ভাই মামলায় জর্জরিত ছিলেন। আমাকে এসপি অফিসে নিয়ে গিয়ে ডান হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। আমরা যদি সেই সময় টিকে না থাকতাম, তাহলে আজ এখানে আমাদের নয়, ওসমানদের বসার কথা ছিল।

 

জুলাই শহীদদের স্মরণ করে তিনি বলেন, যাঁদের কারণে আমরা আজ এখানে বসতে পারছি, তাঁদের পরিবারকে এখনো কান্নাকাটি করতে হচ্ছে। তাঁরা এখনো মনে করেন, রাষ্ট্র ও পুরো সিস্টেম তাঁদের প্রতি যে সহমর্মিতা দেখানোর কথা, তা দেখাতে পারছে না। এটি আমাদের জন্য লজ্জার।

 

সংসদ সদস্য বলেন, জুলাই আন্দোলন থেকে উঠে আসা একজন হিসেবে আমি নিয়মিত শহীদ ও আহত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি। এবং মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে দেখা করে আহতদের নতুন গেজেট প্রকাশ, ও কবর সংরক্ষণসহ বিভিন্ন জটিলতার বিষয়ে আলোচনা করছি।”

 

তিনি বলেন, জেলার চার শহীদের কবর ঢাকা জেলা প্রশাসনের আওতায় হলেও তাঁরা নারায়ণগঞ্জের শহীদ। ফলে সমন্বয়ের অভাবে কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না। অথচ এটি শুধু সমন্বয়ের বিষয়। একটি জেলা প্রশাসন দায়িত্ব নিলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।

 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানসংক্রান্ত মামলার বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেড় শতাধিক মামলা আছে। অন্তত ১০টি মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত ও বিচার শেষ করা যেতে পারে। নারায়ণগঞ্জের অন্তত পাঁচটি মামলাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এতে শহীদ পরিবার ও আহতদের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে।

 

মামলায় নিরীহ মানুষকে আসামি করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি নিরীহ কেউ মামলায় জড়িয়ে থাকে, তদন্ত করে ব্যবস্থা নিন। কিন্তু এভাবে তো বলা যায় না যে নারায়ণগঞ্জে কোনো অপরাধই হয়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এখানে গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড হয়েছে। অপরাধীরা অবশ্যই আছে। তাঁদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

 

তিনি অভিযোগ করেন, আমরা দেখছি যে নৌকার চেয়ারম্যানেরা, যারা জুলাই গণহত্যার ৫ থেকে ১০টি হত্যা মামলার আসামি, তাদের একদিনও জেল খাটতে হলো না। এবং তারা রাস্তায় হাঁটছে ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। অন্তত আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেবে। কিন্তু এখনো অনেক নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রকাশ্যে চেয়ারম্যান পরিচয়ে ঘুরছেন। এটি কীভাবে সম্ভব? আসামিদের প্রশাসন দেখে না, এটি ভুল। কারা নৌকার চেয়ারম্যান ও কারা শামীম ওসমানদের সঙ্গে ছিল, তাদের আমরা চিনি।

 

তিনি আরও বলেন, একটি শহীদ পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, মামলাবাজি ও আসামিদের হুমকির কারণে তাঁদের চাঁদপুরে চলে যেতে হয়েছে। এটি নারায়ণগঞ্জের জন্য লজ্জার।

 

পুলিশের গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে গোয়েন্দা নজরদারি কতটা কার্যকর, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অতীতে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয়ে প্রশাসনের তৎপরতা ছিল, কিন্তু এখন কিছু ঘটনায় সেই একই মাত্রার সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।”

 

জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সি, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সিফাত উদ্দিন, সদর উপজেলার সহকারী ভূমি কর্মকর্তা সাদিয়া আক্তার, মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু, মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মাওলানা মঈনুদ্দিন আহমাদ, আমির মাওলানা আবদুল জব্বার, গণসংহতি আন্দোলন জেলার সমন্বয়কারী তারিকুল ইসলাম সুজন, জেলা এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক নিরব রায়হান, মহানগরীর জাবেদ আলমসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতরা উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভায় জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণ, তাদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বক্তব্য দেন অংশগ্রহণকারীরা।

সম্পর্কিত বিষয়: