দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপির সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের চার নেতা। দলীয় প্রার্থীর পাশে না দাঁড়িয়ে নিজেদের রাজনৈতিক হিসাবকে প্রাধান্য দিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তাদের দল থেকে বহিস্কার করে বিএনপি। সেই নেতারা এখন আবারও বিএনপিতে ফেরার পথ খুঁজছেন।
আলোচিত সেই চার নেতা হলেন, সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, আতাউর রহমান খান আঙ্গুর, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রেজাউল করিম ও মোহাম্মদ শাহ আলম। তারা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচনে জয় তো দূরের কথা, প্রত্যাশিত রাজনৈতিক অবস্থানও ধরে রাখতে পারেননি।
এখন বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মাধ্যমে লবিং করছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় অনুসারীদেরও দলে ফেরার আশায় রাখছেন তারা।
একসময় বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এই চার নেতা দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা ও অনুসারীদের শক্তির ওপর ভরসা করেছিলেন। তাদের নির্বাচনী সিদ্ধান্তে দলীয় প্রার্থীদের ভোটের সমীকরণে প্রভাব পড়ার আলোচনা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেরা জয়ী হতে পারেননি। দলীয় পরিচয় হারিয়ে এখন তাদের রাজনৈতিক অবস্থান অনিশ্চিত। যে দলের পরিচয়ে দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছেন, সেই দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে এখন আবারও সেই দলেই ফেরার চেষ্টা করছেন তারা।
দলীয় মনোনয়ন না পাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতা হলেও বিএনপির সিদ্ধান্ত মেনে প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল তাদের সামনে। কিন্তু সেই পথ বেছে না নিয়ে চার নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। এতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কৃত হন তারা। নির্বাচনের ফলও তাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে যায়নি। বরং দলীয় সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের অবস্থান হারিয়ে ফেলেছেন।
এখন বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মাধ্যমে যোগাযোগ ও লবিংয়ের চেষ্টা চলছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় বিএনপি তাদের ফেরানোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর তাদের প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে নেতৃত্ব কতটা নমনীয় হবে, সেটিই এখন বড় বিষয়।
চার নেতার মধ্যে মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি আলোচিত। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করা এই নেতা একসময় নারায়ণগঞ্জের সাংগঠনিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে নারায়ণগঞ্জ-৩ ও নারায়ণগঞ্জ-৪, দুই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
দুই আসনেই পরাজিত হওয়ার পাশাপাশি জামানত হারান গিয়াস উদ্দিন। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর বিএনপির সাংগঠনিক পরিচয়ও হারান তিনি।
আড়াইহাজারের রাজনীতিতে আতাউর রহমান খান আঙ্গুর একসময় বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন। নারায়ণগঞ্জ-২ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত এই নেতা এবার দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশ নিয়ে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত পরিচিতির ওপর নির্ভর করলেও দলীয় সংগঠনের বাইরে নিজের অবস্থান ধরে রাখার মতো ফল পাননি আঙ্গুর। এখন তাঁর দলে ফেরার সম্ভাবনা ঘিরে অনুসারীদের মধ্যে প্রত্যাশা রয়েছে। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর বিএনপির নেতৃত্ব তাঁকে কীভাবে বিবেচনা করবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
মোহাম্মদ শাহ আলাম ২০০৮ সালের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগের সারাহ বেগম কবরীর কাছে মাত্র ২ হাজার ৩৮৯ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। এবার দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁকে বহিষ্কারের মুখে ফেলে। নির্বাচনে প্রায় ৩৯ হাজার ভোট পেলেও জয়ী হতে পারেননি তিনি।
তাঁর প্রার্থিতাকে ঘিরে বিএনপির ভোট বিভাজনের আলোচনা ছিল। শেষ পর্যন্ত বিএনপি-সমর্থিত জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীও পরাজিত হন এবং জয় পান এনসিপির আব্দুল্লাহ আল আমিন। শাহ আলামের ব্যক্তিগত ভোট থাকলেও তা দলীয় পরিচয় ও সাংগঠনিক অবস্থানের বিকল্প হয়ে ওঠেনি। নির্বাচনের পর ফতুল্লায় তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নেতাকর্মীদের অনেককেই আগের মতো প্রকাশ্যে সক্রিয় দেখা যায় না।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও চারবারের সংসদ সদস্য অধ্যাপক রেজাউল করিম সোনারগাঁয়ের রাজনীতিতে একসময় বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে জামানত হারান। এখন তার সামনেও বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার ও বিএনপির রাজনীতিতে ফেরার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চার নেতার দলে ফেরার চেষ্টা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তাদের অনুসারীদেরও দলে ফেরার সম্ভাবনার কথা বলে আশাবাদী করে রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কোনো নিশ্চিত আশ্বাস রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে দলে ফেরার প্রত্যাশা থাকলেও তা বাস্তবে রূপ নেওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
এখন বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য তাদের উদ্যোগের আলোচনা থাকলেও শেষ সিদ্ধান্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের পর তারা আবারও দলে জায়গা পাবেন কি না, তা অনিশ্চিত। তবে যে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে তারা নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, এখন সেই দলেই ফেরার পথ খুঁজতে হচ্ছে তাদের।


































