গলা ও বুকজ্বালাপোড়া সাধারণত অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থেকে হয়। আর আমরা অনেকেই এটাকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ভেবে অবহেলা করে থাকি দিনের পন দিন, মাসের পর মাস ও বছরব্যাপী।
কিন্তু জানেন কি? এই সাধারণ বুক জ্বালাপোড়াই অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে?
আজকের আর্টিকেল থেকে আমরা সহজভাবে জানবো—
গলা-বুক জ্বালাপোড়া কেন হয়, কারা বেশি ঝুঁকিতে, কখন ভয়ংকর হতে পারে? আর কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা যায়।
আসলে আমাদের শরীরে কী ঘটে?
চলুন খুব সহজভাবে জেনে নিই…
আমাদের খাবার মুখ থেকে খাদ্যনালি দিয়ে পাকস্থলীতে যায়। খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর সংযোগস্থলে একটি বিশেষ পেশি থাকে, যাকে বলা হয় লয়ার ইসোফেজিয়ল স্ফিংটার (Lower Esophageal Sphincter)।
এটা একমুখী দরজার মতো কাজ করে। খাবার নিচে যেতে দেয়, কিন্তু পাকস্থলীর অ্যাসিড উপরে উঠতে দেয় না। যখন এই পেশি দুর্বল হয়ে যায় বা ঠিকভাবে বন্ধ হতে পারে না, তখন পাকস্থলীর অ্যাসিড উপরে উঠে খাদ্যনালিতে চলে আসে। আর তখনই শুরু হয় যত বিপত্তি; বুকজ্বালা-পোড়া, গলাজ্বালা, টক ঢেকুর ওঠা, গলা খুসখুস করা, কিছু আটকে আছে এমন অনুভূতি, ও অস্বস্তিবোধ প্রভৃতি লক্ষণ দেখা দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় হার্টবার্ন (Heartburn)। যখন এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং নিয়মিত অ্যাসিড উপরে উঠে আসে, তখন একে বলা হয় গ্যাট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিস (Gastroesophageal Reflux Disease) সংক্ষেপে গার্ড (GERD)।
কেন হয় এই সমস্যা?
• যদি লয়ার ইসোফেজিয়ল স্ফিংটার (Lower Esophageal Sphincter) দুর্বল হয়ে যায়
• যদি হায়াটাস হার্নিয়া থাকে
• যদি পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি হয়
• যদি পেটের ভেতরের চাপ বেড়ে যায়—যেমন গর্ভাবস্থা বা স্থূলতায়
• যদি খাবার নিচে নামতে দেরি হয়
সাধারনত এই সমস্যা হলে পাকস্থলী থেকে অ্যাসিড উপরে উঠার সুযোগ পায়।
কারা বেশি ঝুঁকিতে আছেন?
• ওজনাধিক্য বা স্থূল ব্যক্তি
• ধূমপানকারী
• যারা ঘন ঘন মাত্রাতিরিক্ত বা অনেক বেশি পরিমাণে খাবার খান
• খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়েন
• অতিরিক্ত তেলেভাজা ও তেল-মশলাযুক্ত খাবার গ্রহণকারী
• অতিরিক্ত চা, কফি ও কোমল পানীয় পানকারী
• গর্ভবতী নারী
• মানসিক চাপগ্রস্ত ব্যক্তি
• যারা খালি পেটে থাকে
• যারা খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়ে
কী কী লক্ষণ দেখা যায়?
• বুকের মাঝখানে জ্বালাপোড়া অনুভব; মাঝেমধ্যে বা সর্বদা হতেপারে
• খাবার খাওয়ার পর গলা পর্যন্ত টক বা তেতো পানি উঠে আসা পানি উঠে আসা
• গলায় কিছু যেন আটকে আছে এমন অনুভূতি
• ঢেঁকুর; টক ঢেকুর ওঠা
• গলা খুসখুস করে বা কাশি হয়
• খাবার গিলতে অস্বস্তিবোধ বা কষ্ট হওয়া
• স্বর ভেঙে যাওয়া
একটি বিষয়ে মনে রাখা খুবই জরুরী, আর তা হলো-
যদি বুক জ্বালার সাথে—
• বাম হাত বা ঘাড়ে ব্যথা হয়
• শ্বাসকষ্ট
• ঠান্ডা ঘাম
• বমিভাব
• তীব্র দুর্বলতা থাকে—তাহলে দেরি না করে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে বুক জ্বালাকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
এই সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে কী হতে পারে?
এখন অনেকেই বলবেন—
“আরে এটা তো গ্যাস্ট্রিক সমস্যা, এতে আবার কী হবে?”
কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলা করলে—
• খাদ্যনালিতে ঘা হতে পারে
• খাদ্যনালি সরু হয়ে যেতে পারে
• রক্তশূন্যতা হতে পারে
• এমনকি কোষের পরিবর্তন হয়ে
• ব্যারেটস্ ইসোফেগাস (Barrett's esophagus) হতে পারে; আর ব্যারেটস্ ইসোফেগাস (Barrett’s Esophagus) থেকে ভবিষ্যতে ইসোফেজিয়ল ক্যান্সার (Esophageal cance) হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে
তাই অবহেলা নয়, সচেতনতা জরুরি। সচেত থাকলে বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে বেঁচে যাওয়া যায়।
এখন প্রশ্ন—আপনি কী করবেন? আপনার করণীয় কী?
গলা-বুকজ্বালা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের দুটি কাজ করতে হবে। আর তা হলো খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা। চলুন সহজে জেনে নিই বাস্তবতার নিরিখে কি কি পরির্বন আনা আবশ্যক…
১) খাদ্যাভ্যাসে যেসব পরিবর্তন আনতে হবে:
• একসাথে বেশি খাবেন না
• অল্প অল্প করে বারবার খাবার খাবেন
• অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার ও ভাজাপোড়া কম খাবেন
• টক, ঝাল ও অতিরিক্ত তেল এড়িয়ে চলুন
• রাতে হালকা খাবার খাবেন
• ভালো করে চিবিয়ে চিবিয়ে খাবেন
• চা-কফি সীমিত করুন
• খাওয়ার সময় পেট পুরো ভর্তি করে খাবেন না
• খাবারের সময় ১/৩ (ওয়ান-থার্ট) মেনে চলুন; অর্থাৎ, পুরো পাকস্থলীর তিন ভাগের এক ভাগ খাবার দ্বারা, এক ভাগ পানি দ্বারা পূর্ণ করুণ আর এক ভাগ ফাঁকা রাখুন। এই ”ওয়ান-থার্ট” মেনে চললে আপনার পাকস্থলীর সমস্যা অনেক কমে যাবে এবং পাকস্থলীর সমস্যা নিয়ন্ত্রণে থাকার সম্ভাবনা খুব বেশি।
২) জীবনযাত্রায় যেসব পরিবর্তন আনতে হবে:
• রাতের খাবার সম্ভব হলে ঘুমানোর ২–৩ ঘণ্টা আগে খাবেন। আর সম্ভব না হলে খাবার কম খাবেন।
• খাওয়ার পরপর শোবেন না
• ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
• ধূমপান বন্ধ করুন; যদি একান্তই বন্ধ করতে না পারেনে, তা হলে কমিয়ে ফেলুন
• মাত্রাতিরিক্ত চা-কফি পান বন্ধ করুন; কম পান করুন
• বালিশ একটু উঁচু করে শুতে পারেন; বেশি উঁচু করবেন না, তা হলে ঘাড় ব্যথা করবে
• বিছানা মাথার দিক থেকে পায়ের দিকে হালকা ঢালু এমন বিচানায় শুবেন
• নিয়মিত হাঁটুন; অন্তত দৈনিক ২০-৪০ মিনিট হাঁটুন
• ৫-১০ মিনিট হালকা ব্যায়াম করুন; ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন
• দৈনিক ইয়োগা বা যোগব্যায়াম করুন; পেটের ও মানসিক চাপ কমানোর ব্যায়াম
• টেনশন বা দুশ্চিন্তা দূর করুন; একেবারে দূর করতে না পারলেও কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন
• রাগ বা উত্তেজনা রোগের বৃদ্ধি ঘটায়; তাই রাগ না করা, উত্তেজিত না হওয়ার চেষ্টা করবেন
• হাসিখুশি রোগের উপশম ঘটায়; তাই হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করুন
• রাত্রি জাগা কমিয়ে ফেলুন; যত দ্রুত সম্ভব ঘুমিয়ে পড়ুন
• খুব সকালে (ভোরে) ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন এবং মুক্ত বাতাসে হাঁটা বা ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় উক্ত অভ্যাসসমূহ রপ্ত করতে পারলেই গলা-বুকজ্বালা থেকে মুক্তিসহ দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপন সম্ভবপর হয়ে উঠবে।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা:
হোমিওপ্যাথিতে রোগ নয়, রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী ওষুধ নির্বাচন করা হয়। গলা-বুকজ্বালায় প্রচলিত কিছু ওষুধ—
• Nux Vomica – অতিরিক্ত খাবার, মসলা বা চা-কফির কারণে অ্যাসিডিটি
• Robinia – তীব্র টক ঢেঁকুর ও গলা পর্যন্ত জ্বালা
• Carbo Veg – গ্যাস, পেট ফাঁপা ও জ্বালাপোড়া
• Natrum Phosphoricum – টক পানি উঠে আসা
• Arsenicum Album – জ্বালাপোড়া সাথে অস্থিরতা
এছাড়াও condurango, pulsetilla, ipecac, acid lac, Antim Crud, Natrum Sulp, Ntrum phos, Chelid Maj, Bismuth, Cadmium Sulp প্রভৃতি ঔসধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:
হোমিওপ্যাথিক ওষুধ অবশ্যই অভিজ্ঞ ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করা উচিৎ। দীর্ঘদিনের গার্ড (GERD) বা আলসারের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই আরর্টিকেল শুধুমাত্র চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্য দেওয়ার জন্য ।
ঘরোয়া উপায় সমাধান:
অনেক সময় বিভিন্ন কারণে দ্রুত চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করা যায় না। এক্ষেত্রে কিছু ঘরোয়া উপায় অবলম্বন করলে সাময়িক উপমম পাওয়া যেতে পারে…
ঘরোয়া উপায়সমূহ হলো-
• কুসুম গরম পানি পান
• হালকা দুধ (যদি সহ্য হয়)️
• কলা বা ওটস
• সামান্য আদা
তবে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু ঘরোয়া উপায়ে সীমাবদ্ধ থাকা ঠিক নয়।
অবহেলা না করে কখন দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরী হয়ে পড়ে?
• বুকের ব্যথা খুব তীব্র হলে
• খাবার গিলতে কষ্ট হলে
• বমিতে রক্ত এলে
• ওজন হঠাৎ কমে গেলে
এগুলো হলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
শেষ কথা:
গলা-বুকজ্বালাপোড়া সাধারণ মনে হলেও, অবহেলারসহিত দীর্ঘদিন থাকলে এটি গুরুতর সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও সঠিক জীবনধারা এবং সময় মত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ— এই তিনটি বিষয় মেনে চললেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভবপর হয়ে উঠে; এটিই হলো নিরাপদ থাকার উপায়।
মনে রাখবেন, রোগ প্রতিকারের চেয়ে, রোগ প্রতিরোধই উত্তম পন্থা।
লেখক:
ডা. গাজী খায়রুজ্জামান
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট
মোবাইল: ০১৭৪৩৮৩৪৮১৬



































