ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিমপাড়ের ইউটার্ন এলাকা যেন ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যা নামার পর থেকে ভোররাত পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই সেখানে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ রয়েছে, অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সড়কে চলাচলকারী মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের যাত্রীদের লক্ষ্য করে ওত পেতে থাকে ছিনতাইকারীরা। কখনো চলন্ত যানবাহনে ঢিল বা ভারী বস্তু ছুড়ে চালককে নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য করা হয়। এরপর ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, টাকা, ব্যাগসহ মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এ সময় বাধা দিতে গিয়ে ছিনতাইকারীদের হামলায় আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ২০২৩ সালে কাঁচপুর সেতুর পশ্চিম পাশে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে একজন নিহত ও তার ভাই আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।
সর্বশেষ হামলার শিকার এনজিবি আহ্বায়ক
সবশেষ গত সোমবার (৩১ আগস্ট) রাতে পাঠাও মোটরসাইকেলে ঢাকা থেকে বাসায় ফেরার পথে কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিমপাড়ের ইউটার্ন এলাকায় সশস্ত্র ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন নিউ জেনারেশন অব বাংলাদেশ (এনজিবি)-এর আহ্বায়ক মেহরাব হোসেন প্রভাত।
ভুক্তভোগীর বর্ণনা অনুযায়ী, চলন্ত মোটরসাইকেলে পেছনে বসা প্রভাতকে অন্ধকার থেকে ছুটে এসে মাথায় আঘাত করে ছিনতাইকারীরা। এতে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চালক ও প্রভাত সড়কে ছিটকে পড়েন।
মাথায় হেলমেট থাকায় বড় ধরনের আঘাত থেকে রক্ষা পেলেও প্রভাতের বাম চোয়াল ও চোখে গুরুতর আঘাত লাগে। আঘাতের পর তিনি ঠিকমতো চোখে দেখতে পারছিলেন না বলেও জানা গেছে।
এ সময় ছিনতাইকারীরা তার হাতে থাকা দুটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। পরে পিঠে থাকা ব্যাগটি টানাহেঁচড়া করার সময় ঘটনাস্থলে একটি ট্রাক চলে আসে। বিষয়টি টের পেয়ে ট্রাকচালক ও হেলপার ট্রাক থেকে নেমে এলে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায়।
প্রভাতের স্বজন ও সহকর্মীদের দাবি, ট্রাকচালক ও হেলপারের উপস্থিতির কারণেই ওই মুহূর্তে আরও বড় বিপদ থেকে রক্ষা পান তিনি।
পরে খবর পেয়ে সহকর্মী ও বন্ধুরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। প্রথমে নারায়ণগঞ্জের খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় তাকে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেও চিকিৎসাসেবা সীমিত থাকায় পরে সাইনবোর্ড এলাকার প্রো-অ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে বর্তমানে তিনি বাসায় বিশ্রামে রয়েছেন।
আগেও ঘটেছে প্রাণঘাতী ছিনতাই
কাঁচপুর সেতু ও আশপাশের এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৪ সালের ১৯ এপ্রিল রাত পৌনে ৯টায় মাদ্রসার শিক্ষার্থী মো. সিফাত তার বন্ধু সাগর শেখ (১৯) বাড়ি ফেরার পথে কাঁচপুর সেতুর পশ্চিম পাশে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে। সিফাতের সঙ্গে থাকা দুই হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখন সিফাতের বন্ধু ছিনতাইকারীদের হাত থেকে পালিয়ে গেলে সিফাতকে একা পেয়ে ধারালো চাকু দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে ওই ছিনতাইকারীরা। একপর্যায়ে সিফাতের সঙ্গে থাকা নগদ দুই হাজার টাকা ও তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুতই সটকে পড়ে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৩ এপ্রিল দুপুরে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় সিফাতের মামা আল-ইমাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ছিনতাইকারীদের আসামী করে মামলা দায়ের করলেও পুলিশ কোন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
এমনকি চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিম পাশে ছয়টি দেশীয় ওয়ান শুটার গান ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছিল র্যাব-১১। আবার আগস্টেও একই এলাকার একটি ঝোপ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, গুলি ও সুইচ গিয়ার উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়।
এসব ঘটনায় কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিমপাড়ের অন্ধকার ও নির্জন অংশের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় প্রতিরাতেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের ইউটার্ন এলাকায় নিয়মিত পুলিশের টহল বা দৃশ্যমান উপস্থিতি দেখা যায় না।
তাদের দাবি, ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার পর অনেকেই পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে চান না। মামলা বা অভিযোগ করতে গেলে বাড়তি ঝামেলা ও হয়রানির আশঙ্কায় অনেক ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়। ফলে প্রকৃতপক্ষে এখানে কতটি ছিনতাই হচ্ছে, তার সঠিক পরিসংখ্যানও পাওয়া কঠিন।
অন্যদিকে, কয়েক বছর ধরেই কাঁচপুর সেতু ও আশপাশের এলাকায় অপরাধের অভিযোগ উঠে আসছে। ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে পুলিশ ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে একাধিক টিম কাজ করছে বলে জানিয়েছিল।
তবে সর্বশেষ মেহরাব হোসেন প্রভাতের ওপর হামলার ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পরও অভিযুক্তদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
তাদের প্রশ্ন—ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে যদি সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত ছিনতাইকারীদের দাপট থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
স্থানীয়দের দাবি, কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিমপাড়ের ইউটার্ন ও আশপাশের অন্ধকার এলাকাগুলোতে নিয়মিত পুলিশি টহল, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সিসিটিভি স্থাপন এবং ছিনতাইপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা জরুরি।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ এমদাদুল হক জানান, অভিযোগ দিলে আমি ব্যবস্থা নিবো।


































