নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

মঙ্গলবার,

০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নারায়ণগঞ্জ সদরের ২ এসিল্যান্ডসহ ভূমি অফিসের ২০ জনকে শোকজ

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:২০:৩৯, ৩১ আগস্ট ২০২৬

নারায়ণগঞ্জ সদরের ২ এসিল্যান্ডসহ ভূমি  অফিসের ২০ জনকে শোকজ

নারায়ণগঞ্জ সদর ‍উপজেলার ভূমি অফিসগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়মতো অফিসে উপস্থিত না থাকা এবং অনুপস্থিত থেকেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দেওয়ার ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে দুটি সার্কেল অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিত দেখতে পান তিনি। তবে হাজিরা খাতায় তাদের অনেকের স্বাক্ষর আগে থেকেই দেওয়া ছিল।

সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নারায়ণগঞ্জ নগরীর খানপুর এলাকায় তিনটি সার্কেলের (সদর, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ) ভূমি কমিশনারের কার্যালয় আকস্মিক পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী। এ সময় দুটি কার্যালয়ে গিয়ে নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিত না থাকায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত না থাকলেও অনেকের হাজিরা দেওয়া হয়ে গেছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

 

তিনি বলেন, জনগণ দেশের প্রকৃত মালিক। তাদের সেবা দেওয়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব, কোনো দয়া নয়। তাই নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত থেকে আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে জনগণকে সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

 

এ সময় ভূমি অফিসগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, কয়েকজন নারী কর্মকর্তা একই সঙ্গে প্রশাসনিক ও বিচারিক দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিদর্শনকালে অনিয়মের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এসব বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই হবে না, সরকারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।

 

এদিকে ভূমি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি এবং হাজিরা খাতায় স্বাক্ষরের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির।

তিনি বলেন, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত না থাকার অভিযোগ রয়েছে, অথচ হাজিরা খাতায় তাদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, তাদের প্রত্যেককে প্রথমে শোকজ করা হবে। কেন তারা নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত ছিলেন না, সে বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যা দিতে হবে।

জেলা প্রশাসক বলেন, ইতোমধ্যে তিনটি ভূমি কমিশনারের কার্যালয়ের ১৮ কর্মকর্তা-কর্মচারিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। আরো কয়েকজনকে নিটিশ দেয়া হবে বলেও জানান তিনি। 

 

এই ঘটনায় দুই ভূমি কমিশনারসহ কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রাপ্ত ২০ জন হলেন ফতুল্লা সার্কেলের ভুমি কমিশনার অংমাচিং মারমা, সদর সার্কেলের ভূমি কমিশনার সাদিয়া আক্তার, সদর উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগো আব্দুস সাত্তার, সার্ভেয়ার মো. আসাদুজ্জামান, নাজির কাম ক্যাশিয়ার মাসুম মিয়া, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মাহফুজা আক্তার, সার্টিফিকেট সহকারী সাদিয়া আক্তার, চেইনম্যান মীর মোজাম্মেল হক, অফিস সহায়ক আব্দুস সালাম (রূপম), অফিস সহায়ক ইউনূস আলী, অফিস সহায়ক মোক্তার হোসেন, গাড়িচালক নাদিম হায়দার, সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের কানুনগো ফারুক আলম, সার্ভেয়ার জামাল উদ্দিন, মিউটেশন কাম সার্টিফিকেট সহকারী জান্নাত হোসেন, নাজির কাজী তানজিরুল হক, অফিস সহায়ক মোকলেছ শেখ, চেইনম্যান রফিকুল ইসলাম, ফতুল্লা রাজস্ব সার্কেলের সার্ভেয়ার মিল্টন রায় ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক সাহাদাত।

 

জেলা প্রশাসক আরো বলেন, শোকজের জবাব পাওয়ার পর তা যাচাই করা হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট তিনটি অফিসের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করা হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কখন অফিসে প্রবেশ করেছেন এবং কখন হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেছেন, সেসব বিষয়ও যাচাই করা হবে। নিয়মিত উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সকাল ৯টার মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যথাযথ কারণ ছাড়া কেউ এই নির্দেশনা অমান্য করলে তা অসদাচরণের আওতায় পড়ে।

 

 

সরকারি কোনো অনুষ্ঠান বা দাপ্তরিক কাজে অংশ নেওয়ার কারণে কেউ নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত হতে না পারার বিষয়টি থাকলে তাদের ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ থাকবে বলেও জানান তিনি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য-প্রমাণসহ কেউ তার অনুপস্থিতির যৌক্তিক কারণ প্রমাণ করতে পারলে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

এদিকে নারায়ণগঞ্জের ভূমি অফিসগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সেবা নিতে আসা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এ অবস্থায় সোমবার প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সেবাপ্রার্থীরা। একই সঙ্গে নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে ভূমি অফিসের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

এর আগে গত ৪ মার্চ তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিস আকস্মিক পরিদর্শন করেন। ওই সময়ও অফিসে চরম অব্যবস্থাপনা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতির চিত্র দেখতে পান তিনি।

সকাল ৯টা ১০ মিনিটে অফিসে গিয়ে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে উপস্থিত না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী। তিনি কিছু সময় অফিসের বারান্দায় বসে অপেক্ষা করেন এবং পরে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

 

সেদিন তিনি বলেছিলেন, “এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও অগ্রহণযোগ্য। যারা রাষ্ট্রীয় অর্পিত দায়িত্বে অবহেলা করবেন এবং জনগণের সেবায় বিঘ্ন ঘটাবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে একই ধরনের অভিযোগ পরবর্তীতেও ওঠায় ভূমি অফিসগুলোতে নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সেবা প্রত্যাশীরা।

সম্পর্কিত বিষয়: