নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

মঙ্গলবার,

০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইমপ্যাথি ইন লিডারশীপ : প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষের অনিবার্য উপাদান

ড. মো: বিল্লাল হোসেন:

প্রকাশিত:১৭:২৯, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইমপ্যাথি ইন লিডারশীপ : প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষের অনিবার্য উপাদান

আধুনিক নেতৃত্বের আলোচনায় “ইমপ্যাথি” বা সহানুভূতি এখন আর কেবল একটি নৈতিক গুণ নয় বরং এটি একটি কৌশলগত শক্তি। নেতৃত্বের সাফল্য কেবল নীতিমালা, দক্ষতা বা কঠোর সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে না—এটি নির্ভর করে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়ার ক্ষমতার ওপর। একজন নেতা যখন সহকর্মীর দুঃখ, সংকট, সম্ভাবনা ও প্রেরণাকে অনুভব করতে পারেন, তখন তিনি শুধু প্রশাসক নন, হয়ে ওঠেন পথপ্রদর্শক। ইমপ্যাথি মানে কেবল কারও প্রতি দয়া দেখানো নয় বরং তার দৃষ্টিভঙ্গি বুঝে নেওয়া, অনুভূতিকে সম্মান করা এবং সেই বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী Daniel Goleman তাঁর Emotional Intelligence তত্ত্বে দেখিয়েছেন, নেতৃত্বের কার্যকারিতায় আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক দক্ষতার পাশাপাশি সহানুভূতি একটি মৌলিক উপাদান। তাঁর মতে, যেসব নেতা সহানুভূতিশীল, তারা দলের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল সাফল্য নিশ্চিত করেন।

 

একটি প্রতিষ্ঠানে সহানুভূতিশীল নেতৃত্ব কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি করে। কর্মীরা যখন অনুভব করেন যে তাদের কথা শোনা হচ্ছে, তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত চ্যালেঞ্জ বোঝা হচ্ছে, তখন তারা দায়িত্ববোধ ও আনুগত্যে আরও দৃঢ় হন। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে সহানুভূতিশীল পরিবেশে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, Center for Creative Leadership–এর এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, সহানুভূতিশীল নেতাদের অধীনে কর্মরত দলগুলোতে সহযোগিতা, উদ্ভাবন ও কর্মসন্তুষ্টির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই গবেষণা প্রমাণ করে যে সহানুভূতি কেবল একটি নৈতিক গুণ নয়, এটি একটি ফলপ্রসূ ব্যবস্থাপনা কৌশল।

 

প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে নেতৃত্বের আচরণে। একজন সহানুভূতিশীল নেতা কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করেন। এর ফলে দ্বন্দ্ব কমে, যোগাযোগের মান উন্নত হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণমূলক ধারা সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, সহানুভূতির অভাব কর্মক্ষেত্রে ভীতি, বিচ্ছিন্নতা ও অসন্তোষের জন্ম দেয়। এতে কর্মীরা কেবল নির্দেশ পালনকারী হয়ে পড়ে ফলে তাদের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ফলত প্রতিষ্ঠান স্থবির হয়ে পড়ে। তবে সহানুভূতি মানেই নরম বা দুর্বল নেতৃত্ব নয়। অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা সিদ্ধান্ত গ্রহণে পক্ষপাত সৃষ্টি করতে পারে। একজন দক্ষ নেতা তাই সহানুভূতি ও জবাবদিহিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেন। তিনি মানবিক থাকেন, কিন্তু নীতিগত প্রশ্নে দৃঢ় থাকেন। এই ভারসাম্যই প্রকৃত নেতৃত্বের সৌন্দর্য—যেখানে হৃদয় ও মস্তিষ্ক পাশাপাশি কাজ করে।

 

আজকের বিশ্বে প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল আর্থিক সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়, তারা সামাজিক দায়বদ্ধতা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সহানুভূতিশীল নেতৃত্ব এই মূল্যবোধগুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়। Harvard Business Review–এ প্রকাশিত একাধিক বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বে উচ্চমাত্রার ইমপ্যাথি বিদ্যমান, সেসব প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের সম্পৃক্ততা ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মদক্ষতা বেশি। এর ফলে কর্মী টার্নওভার কমে এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি পায়।

 

বিশেষত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইমপ্যাথি অপরিহার্য। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সম্পর্ক মূলত বিশ্বাস ও মানবিকতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একজন প্রধান শিক্ষক যদি শিক্ষকের ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ বুঝতে পারেন, শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা উপলব্ধি করতে পারেন এবং অভিভাবকের প্রত্যাশা সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারেন, তবে প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে এক উষ্ণ শিক্ষাঙ্গন। এমন পরিবেশে শিক্ষার্থীরা কেবল পরীক্ষায় নয়, মানবিক গুণাবলীতেও সাফল্য অর্জন করে। কারণ তারা শিখে—নেতৃত্ব মানে কেবল কর্তৃত্ব নয়, বরং সহমর্মিতা।

 

ইমপ্যাথি ইন লিডারশীপ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষের অনিবার্য উপাদান। সহানুভূতি নেতৃত্বকে মানবিক করে, মানবিকতা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে, আর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান সমাজকে সমৃদ্ধ করে। একজন নেতা যখন সহকর্মীর কষ্টে পাশে দাঁড়ান, তার সাফল্যে উল্লাস প্রকাশ করেন এবং তার সম্ভাবনায় আস্থা রাখেন—তখন তিনি কেবল কাজ পরিচালনা করেন না, তিনি মানুষ গড়ে তোলেন। আর মানুষ গড়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সাফল্য। সুতরাং বলা যায়, দক্ষতা নেতৃত্বকে কার্যকর করে, কিন্তু সহানুভূতি নেতৃত্বকে মহিমান্বিত করে। হৃদয়ের স্পর্শ ছাড়া নেতৃত্ব অসম্পূর্ণ আর ইমপ্যাথির আলোকেই প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষের পথ সুদৃঢ় ও আলোকিত হয়।

 

ড. মো: বিল্লাল হোসেন

উপাধ্যক্ষ, 

মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, 

কাঁচপুর,সোনারগাঁও, নারায়নগঞ্জ

সম্পর্কিত বিষয়: