নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

শুক্রবার,

০৯ অক্টোবর ২০২৬

আদালত পাড়ায় বিএনপির রাজনীতি: পেশীশক্তি ও সাংগঠনিক শক্তির লড়াই

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:২১:০৪, ৮ অক্টোবর ২০২৬

আদালত পাড়ায় বিএনপির রাজনীতি: পেশীশক্তি ও সাংগঠনিক শক্তির লড়াই

নারায়ণগঞ্জের আদালতপাড়ায় দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়েছে বিএনপি। এতে দুই শিবিরে বিভক্ত বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। দীর্ঘদিন জোটবদ্ধ থাকলেও আদালত পাড়ায় নিজস্ব বলয় ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দ্বন্ধে শীর্ষ নেতারা লিপ্ত হয়েছে সংঘাতে। মঙ্গলবারের হাতাহাতির ঘটনার পর আদালত পাড়ায় দুই পক্ষের পৃথক অবস্থান এবং বৃহস্পতিবার দুই বিএনপি নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার ঘটনায় বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। কারণ এক পক্ষ পেশী শক্তি আরেক পক্ষ সাংগঠনিক শক্তি প্রয়োগ করছে। মোটকথা কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ।

বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা বলছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা নেতৃত্বের টানাপোড়েন এবং আসন্ন আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের প্যানেল নিয়ে মতবিরোধ কাজ করেছে। একসময় একই রাজনৈতিক সমীকরণে থাকা সাখাওয়াত ও আনোয়ারের সম্পর্কের পরিবর্তনও এই বিরোধকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এতে এই দুই নেতাকে ঘিরে আদালত পাড়ায় ভিন্ন ভিন্ন দুইটি বলয় গড়ে উঠেছে। 

গত আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিএনপিপন্থী জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সমর্থনে অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবির সভাপতি এবং এইচ এম আনোয়ার প্রধান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তখন সাখাওয়াত হোসেন খান ও আনোয়ার প্রধানকে একই রাজনৈতিক বলয়ের অংশ হিসেবে দেখা গেছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই সমীকরণ বদলে গেছে।

সরকার হুমায়ুন কবির দুই মেয়াদ সভাপতি থাকায় এবার একই পদে নির্বাচন করতে পারছেন না। আনোয়ার প্রধানও দুই মেয়াদ সাধারণ সম্পাদক থাকায় একই পদে প্রার্থী হতে পারবেন না। ফলে এবার সভাপতি পদে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে আনোয়ার প্রধানের সামনে। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে বর্তমান প্রধান পিপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকিরের নাম আলোচনায় ছিল বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান।

এখানেই সাখাওয়াতের সঙ্গে আনোয়ারের অবস্থানের পার্থক্য তৈরি হয়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সাখাওয়াত হোসেন খান সভাপতি পদে অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট আজিজুল হক মোল্লাকে নিয়ে প্যানেল করতে আগ্রহী। এ নিয়ে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ওপরও তিনি চাপ সৃষ্টি করে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে আনোয়ার প্রধান সভাপতি পদে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ফলে সাখাওয়াতের পছন্দের প্যানেল তার রাজনৈতিক ও নির্বাচনী পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। এখান থেকেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের দূরত্ব সাংগঠনিক বিরোধে রূপ নিতে শুরু করে।

এই বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি প্রশ্ন—আইনজীবী সমিতির নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে কে? বিএনপির রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নাকি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক কাঠামো? 

আনোয়ারপন্থী আইনজীবীদের অভিযোগ, সাখাওয়াত সমিতির নেতৃত্বে নিজের পছন্দের ব্যক্তিদেএ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। বিপরীতে সাখাওয়াতপন্থীদের অবস্থান, বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে তিনি আইনজীবীদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিষয়ে ভূমিকা রাখতেই পারেন।

এ কারণে বিরোধটি এখন শুধু দুই ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুই পক্ষের অনুসারীরাও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছেন। বুধবার বার ভবনে আলাদা টেবিলে দুই পক্ষের আইনজীবীদের বসা এবং পৃথকভাবে অবস্থান নেওয়া তারই দৃশ্যমান প্রতিফলন।

মঙ্গলবারের ঘটনায় পিপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির আহত হন। সাখাওয়াত হোসেন খানকে হেনস্তার অভিযোগও ওঠে। পরে দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। আনোয়ার প্রধান সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে আইনজীবী সমিতিকে বিভক্ত করা, পিপি নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং আইনজীবীদের স্বার্থের বিপক্ষে অবস্থানের অভিযোগ করেন। 

অন্যদিকে সাখাওয়াত হোসেন খানের অভিযোগ, কারও উসকানিতে তাকে অসম্মান করার চেষ্টা করা হয়েছে সেদিন। 

 

বিরোধটি বৃহস্পতিবার আরও রাজনৈতিক রূপ নেয়। সাখাওয়াত হোসেন খানের সঙ্গে অসদাচরণ ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপির দুই নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। 

 

মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুর স্বাক্ষর করা নোটিশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। সন্তোষজনক জবাব না পেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং দলের সব পদ থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

 

এই শোকজের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। কারণ, আইনজীবী সমিতির অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবার মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। অর্থাৎ আদালতপাড়ার নেতৃত্বের প্রশ্নটি এখন দলীয় শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।

এখানে সাখাওয়াতের বর্তমান অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক হওয়ার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে আনোয়ার প্রধান জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। ফলে দুজনেরই নিজস্ব সাংগঠনিক অবস্থান রয়েছে। আদালতপাড়ার বিরোধে সেই দুই সাংগঠনিক বলয়ের প্রভাব পড়ছে।

একসময় একই রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সমীকরণের অংশ থাকা দুই নেতার মধ্যে এই দূরত্ব তাই শুধু একটি পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া সাধারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্বের ভেতরে পরিবর্তিত সম্পর্ক ও প্রভাবের চিত্রও সামনে এসেছে।

ফলে আইনজীবী সমিতির নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কোন সমীকরণে যায় এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম কীভাবে নেতৃত্বের প্রশ্নটি সমাধান করে। একই সঙ্গে শোকজের জবাব ও পরবর্তী সাংগঠনিক সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, মঙ্গলবারের সংঘর্ষ, বুধবারের প্রকাশ্য বিভাজন এবং বৃহস্পতিবারের শোকজ তিন দিনের ধারাবাহিকতায় আদালতপাড়ার বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ আর আড়ালে নেই। এটি এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক ভাঙনের বিষয়টি উন্মোচিত হয়েছে।