বাংলাদেশের রাজনীতির এক জলজ্যান্ত আগ্নেয়গিরি। ইতিহাস সাক্ষী, এই আসনের মাটি যার কথা শোনে, সংসদের ক্ষমতার চাবি তার হাতেই থাকে। তাই বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খাওয়ার লড়াই এখানে অহরহ ঘটে।
বড় বড় দলের হেভিওয়েট প্রার্থীরা যখন মাইকের গর্জনে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করছেন, যখন টাকার বস্তা আর পেশিশক্তির মহড়া চলছে দিনের আলোয়—ঠিক তখনই, সবার চোখের আড়ালে, অন্ধকারের বুক চিরে ঘটে যাচ্ছে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা।
বাতাসের ফিসফাস আর চায়ের কাপের ঝড় ছাপিয়ে সম্প্রতি একটি জরিপ যেন রাজনীতির টেবিলে শক্তিশালী বোমা ফাটালো। জরিপের ফলাফল বলছে, সব সমীকরণ, সব দম্ভ চূর্ণ করে দিতে প্রস্তুত এক ‘নীরব বিপ্লব’। তিনি আর কেউ নন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ‘রিকশা’ প্রতীকের প্রার্থী—খন্দকার আনোয়ার হোসেন।
# ১ লাখ ভোটের ‘বিপ্লবের পথে’
রাজনীতির দাবা বোর্ডে আনোয়ার হাঁটছেন এক ‘নীরব বিপ্লবের’ পথে। তার হাতে নেই কোনো জাদুর কঠি, নেই কোনো ফাঁকা বুলি। কিন্তু তার আছে এক নিখুঁত গাণিতিক ছক। জরিপ বলছে, আনোয়ারের টার্গেট সাধারণ কোনো সংখ্যা নয়—পুরো এক লাখ ভোট। আর এই বিশাল ভোটব্যাংক তিনি তৈরি করেছেন অত্যন্ত সুকৌশলে।
# তাবলীগের সেই ‘নীরব আর্মি’
আনোয়ার হোসেনের শক্তির প্রথম উৎসটি বড়ই রহস্যময়। দীর্ঘদিন ফতুল্লা এলাকায় তাবলীগের কাজের সাথে তিনি আত্মার বন্ধনে জড়িত। কোনো শোরগোল নেই, মিছিল নেই—অথচ পরিসংখ্যান বলছে, এই ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ হাজার রিজার্ভ ভোট রয়েছে, যা কোনো প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই আনোয়ারের ব্যালট বাক্সে পড়ার অপেক্ষায়। ভোটের দিন এই ৩৫ হাজার মানুষ যখন নিঃশব্দে কেন্দ্রে যাবে, তখন প্রতিপক্ষের পায়ের নিচের মাটি সরে যেতে বাধ্য।
# আলেম সমাজ
ফতুল্লার অলিগলিতে ছড়িয়ে আছে প্রায় ৪৮টি মাদ্রাসা। এখানকার প্রায় ১২শ আলেম-ওলামা মাওলানা মামুনুল হকের প্রার্থী আনোয়ারকে বিজয়ী করতে এক গোপন প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ। এই ১২শ আলেম কেবল ১২শ ভোটার নন, তারা একেকজন ইনফ্লুয়েনশিয়াল লিডার। তাদের এক ইশারায় হাজার হাজার ভক্তের ভোট যে কোনো মুহূর্তে পাল্টে দিতে পারে ফতুল্লার ভাগ্যলিপি।
# গার্মেন্টস জগতের ‘মিস্টার ক্লিন’
নারায়ণগঞ্জ মানেই গার্মেন্টস, আর গার্মেন্টস মানেই শ্রমিক অসন্তোষ। কিন্তু এই অগ্নিগর্ভ স্থানেও আনোয়ার এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। দুই দশকের গার্মেন্টস ব্যবসায় যেখানে মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব নিত্য ঘটনা, সেখানে আনোয়ারের কারখানায় আজ পর্যন্ত একটিও অসন্তোষের ঘটনা ঘটেনি। নেই কোনো ব্যবসায়িক দেনার অভিযোগ। হাজার হাজার শ্রমিক আর ব্যবসায়ীরা তাকে দেখছেন আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে। ভোটের দিন এই শ্রমজীবী মানুষের স্রোত আটকাবে সাধ্য কার?
# ২০২১ সালে করোনা কালের কর্মকাণ্ড
গল্পের মোড় ঘুরে যায় ২০২১ সালে। করোনা মহামারী। চারদিকে মৃত্যুর মিছিল। যখন আপন মানুষও লাশ ফেলে পালিয়ে যাচ্ছিল, সংক্রমণের ভয়ে কেউ কাছে আসছিল না—তখন ফতুল্লার রাস্তায় নামল একদল তরুণ। নাম ‘এহসান পরিবার’। নেতৃত্বে ছিলেন এই খন্দকার আনোয়ার।
ধর্ম-বর্ণের দেয়াল ভেঙে ১১৬ টি লাশ দাফন থেকে শুরু করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সৎকার—সবই করেছে আনোয়ারের এই টিম। যখন কোনো হিন্দু পরিবার তাদের স্বজনের সৎকার করতে পারছিল না, আনোয়ারের টিম সেই দায়িত্বে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। মানবতার সেই চরম দুর্দিনে যারা আনোয়ারকে পাশে পেয়েছিল, আজ ভোটের দিনে তারা কি তাকে ফেরাতে পারবে? দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে তৈরি হওয়া এই বিশাল মানবিক ভোটব্যাংকই আনোয়ারের তুরুপের তাস।
উপসংহার: শেষ চালের অপেক্ষা
এলাকাভিত্তিক বন্ধু-বান্ধব আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের বিশাল নেটওয়ার্ক তো আছেই। সব মিলিয়ে আনোয়ার হোসেন এখন আর কেবল একজন প্রার্থী নন, তিনি ফতুল্লার রাজনীতিতে এক ধেয়ে আসা ঝড়।
প্রতিপক্ষরা যখন বড় বড় জনসভায় ব্যস্ত, আনোয়ার তখন নীরবে বুনে চলেছেন বিজয়ের এক সূক্ষ্ম জাল।
ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, রহস্য ততই এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা—কখন শেষ চালটি চালবেন আনোয়ার!


































