নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ইসলামী যুব আন্দোলনের নেতা জাহিদ আল আমিন ওরফে বুলবুল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান আসামি শেখ সিফাতসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তবে স্থানীয়দের দাবি, কথিত ‘সিফাত বাহিনীর’ আরও কয়েকজন সদস্য এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। তাদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় সালেহনগরসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি।
রোববার (২৩ আগস্ট) বুলবুল হত্যা মামলায় শেখ সিফাতসহ সাত আসামিকে ১০ দিনের এবং চার নারী আসামিকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ নুরুল হুদা চৌধুরী। ১০ দিনের রিমান্ডপ্রাপ্তরা হলেন শেখ সিফাত, জুম্মন ওরফে হোয়াইট জুম্মন, সিয়াম, মাহবুব হোসেন ওরফে মাহাফুজ, রিয়াদ, ইরফান ও সিজান ওরফে জিসান। চার নারী হলেন মিনারা, রুমা, নাসিমা ও ইয়াসমিন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ আগস্ট রাতে বন্দরের সালেহনগর এলাকায় হামলায় বুলবুল নিহত হন। এর আগে তার অটোরিকশার গ্যারেজে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় মামলা করেছিলেন তিনি। ওই মামলা করার পর তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে শেখ সিফাতের নেতৃত্বে একদল লোক লোহার পাইপ ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে বুলবুলকে মারধর ও কুপিয়ে গুরুতর আহত করে বলে পুলিশের অভিযোগ। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
গ্রেপ্তার হলেও আতঙ্ক কাটেনি
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বুলবুল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও এলাকায় কথিত সিফাত বাহিনীর আরও সদস্য সক্রিয় রয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন এখনো ধরা না পড়ায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, কথিত সিফাত বাহিনীর যেসব সদস্য এখনো গ্রেপ্তার হয়নি বলে তারা দাবি করছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন—সালেহনগর বাংলাদেশ পাড়ার আক্কা মিয়ার ছেলে আশরাফুল ওরফে কালু, শাহ আলম মিয়ার ছেলে রাব্বী, ইয়াছিন, এনদা মিয়ার ছেলে ফয়সাল, নূর হোসেনের ছেলে পিংকি, সিফাত (২), রিফাত, রাতুল, পাভেল, মেহেদী, সেলিম ও শিপন।
তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে বুলবুল হত্যা মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, এজাহারভুক্ত আসামি বা পুলিশের পক্ষ থেকে ‘সিফাত বাহিনীর সদস্য’ হিসেবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের নাম স্থানীয়দের অভিযোগ ও দাবির ভিত্তিতেই উল্লেখ করা হলো।

যেসব এলাকায় আতঙ্কের অভিযোগ
সালেহনগর, শাহীমসজিদ, খালপাড়া, নূরবাগ, হাফেজীবাগ কলোনি, বাংলাদেশ পাড়া, বাড়ইপাড়া ও বাবুপাড়া এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগের কথা জানা গেছে।
এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই এসব এলাকায় কিশোর ও তরুণদের একটি অংশের নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। বুলবুল হত্যাকাণ্ডের পর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। তারা দ্রুত বুলবুল হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
সিফাতের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা
জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও চাঁদাবাজিসহ শেখ সিফাতের বিরুদ্ধে অন্তত ১৪টি মামলা রয়েছে। তার সহযোগী জুম্মন ওরফে হোয়াইট জুম্মনের বিরুদ্ধে নয়টি এবং রিয়াদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা বিচারাধীন। পুলিশ বলছে, সিফাত ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের তৎপরতা নিয়ে অপেক্ষায় এলাকাবাসী
বুলবুল হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ রাতভর অভিযান চালিয়ে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে ধারালো অস্ত্রসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে রিমান্ডে থাকা আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কারা জড়িত ছিল এবং কথিত সিফাত বাহিনীর অন্য সদস্যরা কোথায় রয়েছে—এসব তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু বুলবুল হত্যার আসামিদের গ্রেপ্তার নয়, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকা প্রত্যেককে তদন্তের আওতায় এনে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সালেহনগর ও আশপাশের এলাকায় পুলিশের নিয়মিত টহল বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন তারা।


































