নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

সোমবার,

০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫

শীতলক্ষ্যার সাথে সংযোগ হারিয়েছে খালগুলো 

রূপগঞ্জে ঢাকা বাইপাসের পেটে সরকারি খাল, উদ্ধারে নেই কোনো উদ্যোগ

নারায়ণগঞ্জ টাইমস

প্রকাশিত:২২:২৯, ৩১ আগস্ট ২০২৫

রূপগঞ্জে ঢাকা বাইপাসের পেটে সরকারি খাল, উদ্ধারে নেই কোনো উদ্যোগ

যোগাযোগ ব্যবস্থাকে তড়ান্বিত করতে ১৮০ ফিট সড়কে প্রশস্ত হচ্ছে গাজীপুর- মদনপুর এশিয়ান হাইওয়ে (ঢাকা বাইপাস)।

নির্মানাধীন রাস্তার কাজ করতে গিয়ে ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাট করেছে সড়কের পাশে থাকা সরকারি খাল। তাতে বন্ধ হয়ে পরেছে পানির স্বাভাবিক চলাচল। মাসের পর মাস বৃহৎ একটি খাল ভরাট হয়ে গেলেও উদ্ধারে নেই উদ্যোগ।

অন্যদিকে প্রত্যেকটি খালের উপর অবৈধভাবে স্থাপনা গড়ে ওঠায় শীতলক্ষ্যা নদীর সাথে সংযোগ হারিয়েছে খালগুলো। আর সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি পোহাচ্ছেন শতশত পরিবার।

জানা যায়, ১৯৮১ সালে কাঞ্চন পৌরসভা, মুড়াপাড়া, ভুলতা ও গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের ২০ গ্রামে প্রায় দুই হাজার বিঘা কৃষি জমি চাষাবাদের সুবিধার্থে “নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী ইরিগেশন প্রজেক্ট”র (এনএনডি) আওতায় এনে বেড়িবাধঁ নির্মাণ করে “জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি” (জাইকা) নামক প্রতিষ্ঠান।

নির্মাণ করা হয় কাঞ্চন থেকে রূপসী এবং কাঞ্চন থেকে ভুলতা গাউসিয়া বেড়িবাঁধ সড়ক। কৃষি আবাদের সুবির্থে পানি নিস্কাশন ও উত্তোলনের জন্য বেড়িবাধেঁর ভেতরে জমি অধিগ্রহন করা হয়।

পরে মুড়াপাড়া ইউনিয়নের বানিয়াদী থেকে গোলাকান্দাইল, কাঞ্চন পৌরসভার কালাদী থেকে গোলাকান্দাইল, হাটাব থেকে বিলের মাঝখান দিয়ে বারুইপার-টানেল-ডুলুরদিয়া-কুশাব হয়ে গোলাকান্দাইল, টেকপাড়া টানেল থেকে কানিবিল-মাউচ্চার বিল হলে বানিয়াদী খাল পর্যন্ত সরকারি অর্থায়নে খাল খনন করা হয়। 

পরবর্তী সময়ে রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে খালের উপরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠে ছোট-বড় শতাধিক স্থাপনা। দীর্ঘ ৩ যুগে খালগুলো পুনরায় খনন না করায় এবং রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে দখল দুষনে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে খালগুলো।

আবার কোথাও জমি অধিগ্রহন করেও খাল খনন করা হয়নি। ফলে পানির স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে যাচ্ছে বেড়িবাধঁ এলাকায়। সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।

কৃষক ও এলাকাবাসী বলেন, বছরের পর বছর ধরে খালের সাথে শীতলক্ষ্যা নদীর সংযোগ বন্ধ হয়ে আছে।  প্রায়ই দেখি টুকরো টুকরো খাল উদ্ধার করতে প্রশাসনের লোকজন আসে, অভিযান করে চলে যায়।

নদীর সাথে খালের যে সংযোগ সে বিষয়ে তাদের কোন দৃষ্টি নেই। অথচ নদীর সাথে খালের সংযোগ না করলে জলাবদ্ধতা কখনোই নিরসন হবে না।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কাঞ্চন পৌরসভা, মুড়াপড়া- ভুলতা ও গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের মধ্যে বেড়িবাধেঁর ভেতরে কাঞ্চন, ত্রিশকাহনিয়া, কালাদী, নলপাথর, কুশাব, ডুলুরদিয়া, টেকপাড়া, বারুইপাড়, হাটাব, আমলাব, শিংলাব, পিঠাঘুড়ি, বেরোক, পানাব, সোনাব, মাসুমাবাদসহ প্রায় ৩০ গ্রামের মধ্যে ২ হাজার ২'শ বিঘা কৃষি জমির চাষাবাদের সুবিধার্থে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে টাটকির খাল, সুতালরির খাল, দাগিরমার খাল, মাউচ্চা ও কানি বিলের খালসহ একাধিক খাল রয়েছে।

কিন্তু হাটাব বারৈপাড় এলাকায় কানি বিলের পিঠাগুড়ি অংশে খালের উপর বাগান বাড়ি নির্মাণ করায় বাধাঁপ্রাপ্ত হচ্ছে পানির স্বাভাবিক চলাচল।

 শীতলক্ষ্যা নদী থেকে টাটকির খাল, সুতালরির খাল, দাগিরমার খাল, কালাদী থেকে গোলাকান্দাইল পর্যন্ত ১৮০ ফিট এশিয়ান হাইওয়ে সংলগ্ন সরকারি খাল দখল হয়ে আছে সড়ক নির্মানাধীন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অবহেলায়।

এছাড়াও অবৈধভাবে সরকারি খালের উপর কালাদী, নলপাথর, কুশাবো এলাকায় গড়ে ওঠেছে একাধিক বালুর গদি, হান্ডিমার্কেট এলাকায় খালের উপরে গড়ে ওঠেছে এটলাস টয়লেট্রিস ও সাবান ফ্যাক্টরি, এনডিই রেডিমিক্স, ম্যাংসাং সার্ভিসিং সেন্টারসহ অসংখ্যক শিল্প প্রতিষ্ঠান ও অর্ধশত বসতবাড়ি। তাতে শীতলক্ষ্যা নদীর সাথে খালগুলোর সংযোগ বন্ধ হয়ে পরেছে।

একদিকে পানি স্বাভাবিক চলাচল বাধাঁগ্রস্থ হচ্ছে, অন্যদিকে বালুর গদির অপ্রয়াজনীয় হাজার হাজার টন পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষি জমি। সামান্য বৃষ্টিতে সৃষ্টি হচ্ছে  জলাশয় আর ভারী বর্ষণে রূপ নিচ্ছে জলাবদ্ধতা। ওই সমস্ত এলাকায় ইরিগেশন প্রজেক্ট বা বেড়ি বাধেঁর ভেতরে এমন জলাবদ্ধতায় শুধু কৃষি আবাদই ব্যহত হচ্ছে না মানুষের জীবন জীবিকাও বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

এছাড়াও কারখানার দুষিত বর্জ্য খোলা মাঠে ছেড়ে দেয়ায় পানিবাহিত রোগ জীবানু ছড়াচ্ছে এলাকার মানুষের মধ্যে।

টেকপাড়া এলাকার আব্দুস সামাদ বলেন, এলাকার ৪/৫ টি খাল বেইনিভাবে দখল করে খালের উপরে অর্ধশত পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ইতিপুর্বে গ্রামবাসীর পক্ষ্যে জেলা প্রশাসকের লিখিত দরখাস্ত দিয়েও কোন সুফল পাইনি। যারা খাল দখল করছে তারাই আবার জলাবদ্ধতার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করছে।

বেলতলা এলাকাল শাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, সরকারি খাল ও সরকারি একোয়ারকৃত জমিতে বালু ভরাট করে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করেছে এনডিই রেডিমিক্স, মেট্রো ওয়ার্কশপ, ইনডেক্স পাওয়ারপ্ল্যান্ট ও এটলাস টয়লেট্রিস নামক প্রতিষ্ঠান। খালের পানি চলাচল বন্ধ করে দেদারচে ব্যবসায় করছে কতিপয় বালু মহাল।

খালের উপর অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে এনডিই রেডিমিক্স কোম্পানির রিডিং প্রোডাকশন ম্যানেজার শাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, আমাদের ফ্যাক্টরিতে সরকারি খাল দখল করিনি তবে ফ্যাক্টরির বর্জ্যগুলো মাঝে মাঝে খালের উপরে পরে।

সেগুলো আমাদের শ্রমীক দিয়ে নিজেরাই পরিষ্কার করে দিই। এছাড়াও একই বিষয়ে জানতে চাইলে এটলাস লয়লেট্রিজ ফ্যাক্টরির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মিজানুর রহমান বলেন, খাল দখলের বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে মালিকরা ভাল বলতে পারবেন।

অধিগ্রহণকৃত সরকারি খালের জমি অবৈধভাবে দখল হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঢাকা বিভাগীয় উপ-প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, আমি অল্প দিন হয় এখানে যোগদান করেছি। এরই মধ্যে ইরিগেশন প্রকল্পের সকল খাল উদ্ধারে প্রধান উপদেষ্ঠা ও জেলা প্রশাসকের বরাবরে দরখাস্ত দেয়া হয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খালগুলো উদ্ধার করা হবে।

তিনি বলেন, সড়ক ও জনপথ বিভাগের গাজীপুর-মদনপুর বাইপাস সড়ক প্রশস্ত করনের সময় রাস্তার পাশের খালটি ভরাট হয়ে গেছে। তবে তারা খালের বিকল্প খাল খনন করে দেয়ার কথা ছিল।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান সহকারী প্রকৌশলী (ব্যবস্থাপনা) এ.এস.এম ইলিয়াস শাহ বলেন, রাস্তার কাজে সরকারি খাল ভরাটের বিষয়ে জানা নেই। তবে খোজঁ নিয়ে দেখছি, এবিষয়ে দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা সরকারি খাল, রাস্তা ও খাস জমি উদ্ধারে কাজ করছি। ইতিপুর্বে ভ্রাম্যমান অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি খাল ও রাস্তা উদ্ধার করেছি।

এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়াও সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাথে কথা হয়েছে, খুব অল্প সময়ের মধ্যে খাল খননের কাজ শুরু করা হবে।
 

সম্পর্কিত বিষয়: