নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

সোমবার,

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ট্রলার ডুবি

ট্রলার ডুবি

ট্রলার ডুবি

আনন্দের যাত্রায় মেঘনায় ডুবে গেল একটি পরিবার

আনন্দের যাত্রায় মেঘনায় ডুবে গেল একটি পরিবার

বিয়ের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল তাদের। আত্মীয়ের বিয়ে, তাই কুমিল্লার হোমনা উপজেলার শ্রীমদ্দি গ্রাম থেকে ট্রলারে উঠেছিলেন একই পরিবারের একাধিক সদস্যসহ মোট ১৩ জন যাত্রী। সেইসাথে ছিল বিয়ের আয়োজনের জন্য দুটি গরু ও একটি ছাগল। গন্তব্য নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের হারিয়া এলাকা। সেখানে আত্মীয় সাজিয়া আক্তার ও শিশিরের বিয়ের আয়োজন। এ উপলক্ষে সাজানো হয়েছিল বিয়ে বাড়ি, আসতে শুরু করেছিলেন আত্মীয়রা। চারদিকে ছিল খুশির আমেজ কিন্তু সেই বিয়ে বাড়ির আনন্দে পৌঁছানোর আগেই মেঘনা নদীতে থেমে যায় তাদের যাত্রা। গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লা থেকে যাত্রা করা ট্রলারটি বিকেলে মেঘনা নদীর মাঝামাঝি পৌঁছালে ঝড় ও তীব্র ঢেউয়ের কবলে পড়ে ট্রলারের ভেতর পানি ঢুকতে শুরু করে। মুহূর্তেই ভারসাম্য হারিয়ে ডুবে যায় ট্রলারটি। সেইসাথে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছিলেন যাত্রীরা। তবে দুর্ঘটনার সময় কাছাকাছি থাকা ‘আমান সিমেন্ট’ কোম্পানির একটি ট্রলার দ্রুত এগিয়ে এসে আটজন যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও ততক্ষণে হেলাল উদ্দিন ও তার তিন সন্তান পানিতে নিখোঁজ। তবে রাশিদা বেগম নামের আরেক নারীকে উদ্ধার করা হলেও তিনি আর বেঁচে নেই। এরপর মেঘনার পাড়ে শুরু হয় স্বজনদের অপেক্ষা। ভীড় জমান স্থানীয় বাসিন্দারা। কারও চোখ নদীর দিকে, কেউ ছুটছেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। ডুবুরি দল আর নৌ-পুলিশ নেমেছে উদ্ধারে। স্বজনদের কাছে তখন প্রতিটি মুহূর্তই যেন দীর্ঘ হয়ে উঠছিল। তাদের চাওয়া হেলাল উদ্দিন ও তাদের সন্তানের মরদেহের সন্ধান। এই অপেক্ষার মধ্যেই পেরিয়ে যায় দিন থেকে রাত। তবে শনিবার সকালে সেই অপেক্ষার এক করুণ পরিণতি আসে। বৈদ্যেরবাজার এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় হেলাল উদ্দিনের তিন সন্তান সজীব হোসেন (২৪), সামিয়া আক্তার (১৭) ও সামিন হোসেনের (৫) মরদেহ। তিন সন্তানের মরদেহ পাওয়া গেলেও বাবা হেলাল উদ্দিন তখনো নিখোঁজ। একদিকে তিন সন্তানের মরদেহ, অন্যদিকে বাবার কোনো খোঁজ নেই স্বজনদের অপেক্ষা তখন আরও ভারী হয়ে ওঠে। তারপরও নদীতে তল্লাশি চালাতে থাকে উদ্ধারকারী দল। মেঘনার পাড়ে হয়তো তখনও কেউ আশায় তাকিয়ে ছিলেন, যদি হেলালের মরদেহ কোথাও পাওয়া যায়। সোমবার দুপুরে সেই অপেক্ষারও শেষ হয়। রতনপুর ব্রিজের নিচ থেকে নৌ-পুলিশ উদ্ধার করে হেলাল উদ্দিনের (৫৫) মরদেহ। চার দিন পর পাওয়া গেল পরিবারের শেষ নিখোঁজ সদস্যকে। শেষ পর্যন্ত সন্তানদের মতো বাবাকেও ফিরিয়ে দিল মেঘনা, তবে জীবিত নয়। বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের হারিয়া এলাকার সাজিয়া আক্তার ও শিশিরের বিয়েতে অংশ নিতে হোমনা থেকে এসেছিলেন তাঁরা। যে বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল হাসি-আনন্দে, সেই বিয়ের সঙ্গে এখন জড়িয়ে গেল একটি পরিবারের পাঁচটি মৃত্যুর স্মৃতি। শেষ পর্যন্ত মেঘনা তাদের সবাইকে ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই ফেরা ছিল এমন এক ফেরা, যার জন্য কোনো স্বজন অপেক্ষা করেন না। বিয়েতে যাওয়ার পথে যে পরিবারটি ঘর থেকে বের হয়েছিল, চার দিন পর সেই পরিবারের বাবা ও তিন সন্তান ফিরলেন মরদেহ হয়ে। আনন্দের জন্য শুরু হওয়া একটি নদীযাত্রা শেষ হলো এক পরিবারের শোকের গল্প হয়ে।

০৬:৫২ পিএম, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সোমবার