নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

সোমবার,

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বন্দরের মদনপুরে থামছে না চাঁদাবাজি

নারায়ণগঞ্জ টাইমস

প্রকাশিত:২২:১৩, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বন্দরের মদনপুরে থামছে না চাঁদাবাজি

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকায় চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলেই অভিযোগ স্থানীয়দের।

বিশেষ করে বন্দর উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে একাধিক চিহ্নিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। থানায় একাধিক এজাহার থাকলেও অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এমন অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীরা।

নির্বাচনের কিছুদিন পর এমপি পুত্র আবুল কাউসার আশা তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে এক স্ট্যাটাসে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দেন। ওই ঘোষণায় তিনি দলীয় পরিচয়ে অপকর্মকারীদেরও ছাড় না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তির সঞ্চার হলেও মদনপুরের বাস্তবতা এখনো আশানুরূপ পরিবর্তন দেখেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘোষণা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। বরং কিছু চক্র আগের চেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।”

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এস এম মমিন, শফিউল্লাহ, এস এম বিল্লাল ওরফে টোকাই বিল্লাল, দিপ্ত হোসেন, আরাফাত ও সুজনসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে বন্দর থানায় একাধিক এজাহার রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে তারা বাজার, ট্রাকস্ট্যান্ড, নির্মাণকাজ, এমনকি ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করে থাকে।

একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দোকান খুলতে হলে চাঁদা দিতে হয়। নতুন কোনো ব্যবসা শুরু করলে প্রথমেই তাদের সঙ্গে ‘বসতে’ হয়। না দিলে নানা অজুহাতে ঝামেলা তৈরি করা হয়।

গোপন সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্তদের কয়েকজন বিগত সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সে সময়ও মদনপুরের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে তারা প্রভাব বিস্তার করে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর কিছুদিন তারা আত্মগোপনে থাকলেও পরে স্থানীয় কিছু বিএনপি নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

এ নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, “দল বদলালেই চরিত্র বদলায় না। যারা চাঁদাবাজি করত, তারা এখন নতুন ব্যানারে একই কাজ করছে।

তবে বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা দাবি করেছেন, দলীয় পরিচয়ে কেউ অপকর্ম করলে তার দায় দল নেবে না। তারা বলেন, দলের নাম ভাঙিয়ে যারা অপরাধ করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পেলে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগ রয়েছে, থানায় একাধিক এজাহার থাকার পরও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান তৎপরতা নেই। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, এজাহার থাকার পরও যদি পুলিশ ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে মানুষ কোথায় যাবে? এতে অপরাধীরা আরও সাহস পায়।

এ বিষয়ে জানতে বন্দর থানার এক ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, তাদের বিষয়ে আইনানুগ প্রক্রিয়া চলমান। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মদনপুরের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে ছোট-বড় মিলিয়ে অসংখ্য দোকান, গুদাম ও পরিবহন ব্যবসা রয়েছে। এসব ব্যবসায়ীদের অভিযোগ চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে, লাভ কমছে, নতুন উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

একজন পরিবহন ব্যবসায়ী বলেন, প্রতিটি ট্রাক থেকে নির্দিষ্ট হারে টাকা নেওয়া হয়। না দিলে গাড়ি আটকে রাখা হয় বা শ্রমিকদের দিয়ে ঝামেলা করানো হয়।”

স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে এলাকায় বড় ধরনের সংঘর্ষ বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে।

এলাকাবাসীর প্রশ্ন কারা বা কোন শক্তির আশ্রয়ে এসব চক্র এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠছে? যেখানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছেন, সেখানে মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন কতটা ঘটছে—তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

স্থানীয় এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, উপরের নেতৃত্ব যদি কঠোর হয়, তাহলে নিচে যারা অপরাধ করছে তারা টিকতে পারার কথা নয়। হয়তো কোথাও না কোথাও ছায়া আছে বলেই তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা নবনির্বাচিত এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম ও তার পুত্র আবুল কাউসার আশার সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

তাদের দাবি—মদনপুরের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডকে চাঁদাবাজমুক্ত ঘোষণা করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে দলীয় পরিচয়ে কেউ অপরাধ করলে তাকে প্রকাশ্যে দল থেকে বহিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

একজন ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা রাজনীতি বুঝি না। আমরা শুধু নিরাপদে ব্যবসা করতে চাই। এমপি সাহেব যদি সত্যিই জিরো টলারেন্স চান, তাহলে মাঠে নেমে ব্যবস্থা নিতে হবে।

মদনপুরের পরিস্থিতি এখন এক ধরনের নীরব উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

চাঁদাবাজির মতো অপরাধ কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।

এখন দেখার বিষয় ঘোষণার ‘জিরো টলারেন্স’ কতটা বাস্তবায়িত হয়, আর মদনপুরের ২৭ নম্বর ওয়ার্ড কবে প্রকৃত অর্থে চাঁদাবাজমুক্ত হয়।