তীব্র গরমের মধ্যে নারায়ণগঞ্জে বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়েই চলেছে। নগর থেকে উপজেলা—বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাড়ছে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও লোকসান।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া, আমলাপাড়া, মিশনপাড়া, ডনচেম্বার, খানপুর, কালিরবাজার, উকিলপাড়া, ডিআইটিসহ বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত একাধিকবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় প্রতিবার এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।
শুধু নগর এলাকাই নয়, জেলার শিল্পাঞ্চলখ্যাত রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ, বন্দর, সিদ্ধিরগঞ্জ ও আড়াইহাজারের বিভিন্ন এলাকাতেও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে। রূপগঞ্জে কয়েক মাস ধরে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ভোল্টেজের ওঠানামায় শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে স্থানীয় শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম
চলতি বছরের এপ্রিলের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলেও নারায়ণগঞ্জের পল্লী বিদ্যুৎ-অধীন এলাকাগুলোতে সরবরাহ ঘাটতির চিত্র স্পষ্ট হয়। নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর দৈনিক চাহিদা ছিল প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছিল ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম। অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর প্রায় ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল প্রায় ১৪০ মেগাওয়াট। ঘাটতি সামলাতে তখন নিয়মিত লোডশেডিং করতে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।
তবে নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিপিডিসি-অধীন এলাকায় পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এপ্রিল মাসে ডিপিডিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তাদের নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৫০৯ মেগাওয়াট এবং চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা তখন দাবি করেন, কোথাও পরিকল্পিত লোডশেডিং নয়; রক্ষণাবেক্ষণ বা কারিগরি ত্রুটির কারণে সাময়িক বিভ্রাট হতে পারে।
পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ক্ষোভ-বিক্ষোভ
বিদ্যুৎ ও লো-ভোল্টেজ সমস্যার প্রতিবাদে চলতি মাসের শুরুতে নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ঘেরাও ও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটে। ৫ আগস্ট অতিরিক্ত লোডশেডিং ও লো-ভোল্টেজ বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর ওয়েবসাইটে এ বছরের এপ্রিল মাসে একাধিক দিনের সম্ভাব্য লোডশেডিং সূচিও প্রকাশ করা হয়েছিল।
রূপগঞ্জে কিছুটা কমেছে লোডশেডিং
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার আজাদ জানান, রূপগঞ্জ এলাকায় আগের তুলনায় লোডশেডিং কমে প্রায় ১০ শতাংশে এসেছে। একই প্রতিবেদনে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু দাবি করেন, আগে লোডশেডিং ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত থাকলেও তা বর্তমানে ৮ থেকে ১০ শতাংশে নেমেছে এবং আরও কমিয়ে ৪ থেকে ৫ শতাংশে আনার আশা করা হচ্ছে।
তবে মাঠপর্যায়ের বাসিন্দা ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাস্তবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
শিল্পকারখানায় উৎপাদনে ধাক্কা
নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল হওয়ায় বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিল্পকারখানায়। এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে বন্দরের একটি ডাইং কারখানায় ২৪ ঘণ্টায় প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার তথ্য উঠে আসে। ওই কারখানায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে দৈনিক উৎপাদন ১০ টন থেকে নেমে দুই টনে দাঁড়িয়েছিল।
বন্দরের আরেকটি কারখানায় দৈনিক ১৫ টন কার্টন পেপার উৎপাদনের বিপরীতে লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ৮ থেকে ৯ টনে নেমে আসে। কারখানাটির পক্ষ থেকে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের অভিযোগ করা হয়েছিল।
সর্বশেষ আগস্টের পরিস্থিতিতেও শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট অব্যাহত থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট। ফলে অনেক কারখানায় উৎপাদন কমেছে, কোথাও কোথাও উৎপাদন বন্ধও রাখতে হচ্ছে।
জাতীয় জ্বালানি সংকটও বড় কারণ
বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থার সমস্যা হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের ঘাটতিও বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।
২৫ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পেট্রোবাংলার তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দেশে দৈনিক প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ ঘাটতি থাকছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো।
গ্যাসের এই ঘাটতির প্রভাব শিল্পকারখানার পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও পড়ছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্য রক্ষা করতে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে সাম্প্রতিক জাতীয় প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে।
সামনে কী?
সংশ্লিষ্টদের মতে, নারায়ণগঞ্জে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের জন্য একদিকে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে হবে, অন্যদিকে স্থানীয় বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আদেশ, শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই দ্রুত লোডশেডিং কমানো, ভোল্টেজের ওঠানামা বন্ধ করা এবং শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ ও শিল্প উদ্যোক্তারা।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিকাল পর্যন্ত তথ্যমতে—নারায়ণগঞ্জে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। কোথাও জাতীয় সরবরাহ ঘাটতি, কোথাও স্থানীয় বিতরণব্যবস্থা, আবার কোথাও কারিগরি সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। এর সঙ্গে গ্যাস সংকট যুক্ত হওয়ায় জেলার শিল্পাঞ্চলের সংকট আরও গভীর হয়েছে।


































