নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

শনিবার,

১৮ জুলাই ২০২৬

দুর্ভোগ

দুর্ভোগ

সরকারি খাল দখল করে ছাত্রদল নেতার দোকান বাণিজ্য!

সরকারি খাল দখল করে ছাত্রদল নেতার দোকান বাণিজ্য!

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা উপজেলার মাসদাইর পুলিশ লাইন এলাকায় সরকারি খাল দখল করে অবৈধভাবে দোকান নির্মাণ ও বাণিজ্য পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে জেলা ছাত্রদলের এক সাবেক নেতার বিরুদ্ধে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি ইয়াসিন আরাফাত। তার নেতৃত্বে ও প্রভাব খাটিয়ে খাল দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী ও আধা-পাকা দোকান, যা বর্তমানে একটি সুসংগঠিত বাণিজ্যিক কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাসদাইর পুলিশ লাইন সংলগ্ন খালটি একসময় এলাকার পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। বর্ষা মৌসুমে আশপাশের এলাকার পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য খালটি কার্যকর ভূমিকা রাখত। তবে কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে খালটির বিভিন্ন অংশ ভরাট করা হয়। প্রথমে ময়লা-আবর্জনা ফেলে ভরাট শুরু হলেও পরে পরিকল্পিতভাবে মাটি ফেলে খালটি সংকুচিত করা হয়। এরপর দখলকৃত অংশে টিনশেড, কাঠামো ও আধা-পাকা দোকান নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে সেখানে সারি সারি দোকান দেখা যায়, যেখানে মুদি দোকান, চায়ের দোকান, মোবাইল সার্ভিসিং আইটেমসহ বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, পুরো বিষয়টি একটি নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ইয়াসিন আরাফাত। অভিযোগ রয়েছে, এই দোকান বাণিজ্য সরাসরি ইয়াসিন আরাফাত নিয়ন্ত্রণ না করলেও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং ফতুল্লা থানা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি হৃদয় মাদবর মাঠপর্যায়ে সবকিছু দেখভাল করছেন। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ, দোকান বরাদ্দ দেওয়া, ভাড়া নির্ধারণসহ সব কার্যক্রম তার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাল দখল করে দোকান নির্মাণের সময় প্রতিটি দোকানের জন্য ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘সিকিউরিটি মানি’ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের ভাড়া দিতে হচ্ছে। টাকা না দিলে দোকান পাওয়া তো দূরের কথা, সেখানে ব্যবসা পরিচালনাও সম্ভব নয় বলে অভিযোগ করেছেন তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানদার বলেন, আমরা বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে দোকান নিয়েছি। এখানে ব্যবসা করতে হলে তাদের নিয়ম মেনে চলতেই হবে। কোনো ধরনের অভিযোগ করার সাহস নেই, কারণ তারা প্রভাবশালী। আরেকজন ব্যবসায়ী জানান, প্রথমে বলা হয়েছিল সাময়িকভাবে দোকান বসানো যাবে। কিন্তু এখন এটি স্থায়ী আকার ধারণ করেছে। নিয়মিত ভাড়া দিতে হচ্ছে, না দিলে দোকান ছেড়ে দিতে বলা হয়। এদিকে খাল দখলের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা দিন দিন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আগে বৃষ্টি হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যেত। এখন একদিন বৃষ্টি হলে তিন-চার দিন পানি জমে থাকে। খাল দখল করার কারণেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। আরেকজন বলেন, আমরা অনেকবার প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে মনে হচ্ছে প্রভাবশালীদের কারণেই প্রশাসন নীরব রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর এলাকায় খাল দখল ও ভরাটের ফলে শুধু জলাবদ্ধতাই নয়, পরিবেশের উপরও মারাত্মক প্রভাব পড়ে। পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইয়াসিন আরাফাতের মুঠো ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দাবি করেছে, ওই জায়গাটি আসলে খাল নয়, এটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। স্থানীয়দের সুবিধার জন্য দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাশফাকুর রহমান সরকারি খাল দখল করা সম্পূর্ণ অবৈধ। এ ধরনের অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে, আমরা খতিয়ে দেখছি। তিনি আরও জানান, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং প্রয়োজন হলে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। এদিকে সচেতন মহল মনে করছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় এ ধরনের অবৈধ দখল বাণিজ্য দিন দিন বাড়ছে। ফলে একদিকে সরকারি সম্পত্তি বেহাত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। তাদের মতে, শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের কাজ করার সাহস না পায়। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত তদন্ত করে খালটি পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং অবৈধভাবে নির্মিত দোকানপাট উচ্ছেদ করতে হবে। পাশাপাশি যারা এই দখল বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা। বর্তমানে পুরো বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। এখন দেখার বিষয়, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয় এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে কী উদ্যোগ গ্রহণ করে।

০৯:৪১ পিএম, ৩০ মার্চ ২০২৬ সোমবার

রূপগঞ্জে সড়কে ময়লার ভাগাড়, নাকাল জনজীবন

রূপগঞ্জে সড়কে ময়লার ভাগাড়, নাকাল জনজীবন

রূপগঞ্জে সড়কে ময়লার ভাগাড়, নাকাল জনজীবন রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল চৌরাস্তা এলাকার গুরুত্বপূর্ণ এশিয়ান হাইওয়ে বাইপাস সড়কটি এখন যেন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সড়কের ওপর গড়ে ওঠা বিশাল ময়লার ভাগাড় থেকে ছড়িয়ে পড়ছে অসহনীয় দুর্গন্ধ, যা প্রতিদিন হাজারো পথচারী, যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। এই পরিস্থিতি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ হুমকিতে রূপ নিচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোলাকান্দাইলসহ আশপাশের বিভিন্ন হাটবাজার, মাছ ও সবজির আড়ত, দোকানপাট এবং আবাসিক এলাকার বর্জ্য নিয়মিতভাবে এনে ফেলা হচ্ছে এই সড়কের ওপর। দিনের পর দিন জমে থাকা এসব বর্জ্য পচে তৈরি হচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। সড়কের একাংশ দখল করে থাকা এই ময়লার স্তূপের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। সড়ক দিয়ে চলাচলরত পথচারীরা নাকে রুমাল বা কাপড় চেপে কোনোভাবে এলাকা অতিক্রম করছেন। অনেকেই জানান, কয়েক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। বৃষ্টি হলে পচা ময়লা পানির সঙ্গে মিশে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, সৃষ্টি হয় আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি। তখন সড়কটি যেন একটি অস্থায়ী নর্দমায় পরিণত হয়। যেখানে এই ময়লার ভাগাড় গড়ে উঠেছে, তার কাছেই রয়েছে একটি ব্যস্ত বাসস্ট্যান্ড। এই স্ট্যান্ড থেকে দেশের পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে। ফলে প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই দুর্গন্ধময় পরিবেশের শিকার হচ্ছেন। স্থানীয়দের দাবি, এই পরিস্থিতির কারণে অনেককে হাসপাতালে পর্যন্ত নিতে হয়েছে। বাসচালক হেকমত আলী খান বলেন, এই সড়ক এখন চালকদের জন্য এক ধরনের ফাঁদে পরিণত হয়েছে। ময়লার স্তূপের কারণে রাস্তার অবস্থা খারাপ হয়ে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নতুন চালকরা না বুঝে এই গর্তে পড়ে বিপদে পড়ছেন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পথচারী নেয়ামত উল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। অথচ এখানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে দাঁড়ানোই যায় না। দুর্গন্ধে শ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা বারবার অভিযোগ করেও কোনো স্থায়ী সমাধান পাইনি। কলেজশিক্ষার্থী আমেনা আক্তার শিউলি বলেন, প্রতিদিন পড়াশোনার জন্য এই পথ দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু ময়লার গন্ধ এতটাই তীব্র যে নাকে রুমাল চেপেও কোনো লাভ হয় না। অনেক সময় মাথা ঘুরে যায়। পরিবেশবিদ বন্দনা শিবা এ প্রসঙ্গে বলেন, অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি নীরব কিন্তু ভয়াবহ সংকট, যা ধীরে ধীরে মানুষের জীবনযাত্রা, পরিবেশ এবং অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। খোলা স্থানে পচনশীল বর্জ্য জমে থাকলে সেখান থেকে মিথেনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। একই সঙ্গে এসব বর্জ্য থেকে ছড়ানো জীবাণু মানুষের শরীরে মারাত্মক রোগের সৃষ্টি করতে পারে। একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আধুনিক ডাম্পিং সিস্টেম, পুনর্ব্যবহার কার্যক্রম এবং সর্বোপরি জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। স্থানীয় ডিকেএমসি হসপিটাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নজরুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, এই এলাকায় একাধিক হাসপাতাল রয়েছে। রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে এসে উল্টো ময়লার দুর্গন্ধে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। রূপগঞ্জ উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আইভী ফেরদৌস খান বলেন, পচা ময়লা থেকে উৎপন্ন গ্যাস ও জীবাণু মানুষের শরীরে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, অ্যালার্জি এবং ভাইরাসজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি আরও বিপজ্জনক। গোলাকান্দা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন মোল্লা বলেন, উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে আমরা নিয়মিতভাবে ময়লা পরিষ্কার করার চেষ্টা করি। কিন্তু নির্দিষ্ট ডাম্পিংয়ের স্থান না থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ময়লা জমে যায়। স্থায়ী সমাধানের জন্য নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা চালু করা অত্যন্ত জরুরি। রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা নিয়মিতভাবে সড়কটি পরিষ্কার করার জন্য অভিযান চালাচ্ছি। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। ইতোমধ্যে ময়লা ডাম্পিংয়ের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করছি, আগামী এক মাসের মধ্যে সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম শুরু করা যাবে।

০৯:৫২ পিএম, ২৯ মার্চ ২০২৬ রোববার