নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

শুক্রবার,

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফতুল্লার রামারবাগে বিএনপির দুই শীর্ষ নেতার  উপর হামলা, নেপথ্যে মাস্টার মাইন্ড কে?

নারায়ণগঞ্জ টাইমস

প্রকাশিত:২১:১৯, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফতুল্লার রামারবাগে বিএনপির দুই শীর্ষ নেতার  উপর হামলা, নেপথ্যে মাস্টার মাইন্ড কে?

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার রামারবাগে থানা বিএনপির দুই শীর্ষ স্থানীয় নেতা রুহুল আমিন শিকদার ও আনিছুর রহমানের ওপর হামলা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ঘিরে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তোলপাড়। কী কারণে এই হামলা

, কার ইন্ধনে এবং এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ কাজ করেছে কি না—তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
ঘটনার পর সামনে এসেছে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষ করে হামলার আগে কথিত হামলাকারী ও বহিস্কৃত  ছাত্রদল নেতা মোহন কার সঙ্গে বারবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করছিলেন—তা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে নানা গুঞ্জন। 


ফলে হামলার নেপথ্যের প্রকৃত চিত্র জানতে কললিস্ট, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজের দিকে এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।


অভিযোগে এক ঘটনা, লিখিত অভিযোগে অন্য চিত্র------


সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রামারবাগের ঘটনার সূত্রপাত হয় ফতুল্লা থানা বিএনপির সহ-সাধারণ সম্পাদক আনিছুর রহমানকে কেন্দ্র করে। হামলাকারীদের নেতৃত্বদানকারী মোহন ও আলাতফ প্রথমে এসে আনিছুর রহমান কে চর থাপ্পর মারতে শুরু করেন। এ সময় সাথে থাকা রুহুল আমিন শিকদার বাধা প্রদান সহ  প্রতিবাদ করেন।  তখন হামলাকারীরা রুহুল আমিন শিকদারের ওপর চড়াও হয়। এতে করে সুযোগ বুঝে আনিছুর রহমান দৌড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ঘটনার সংবাদ পেয়ে এই দুই শির্ষ নেতার কর্মী, সমর্থকরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। বিপদ আচ করতে পেরে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে হামলার শিকার দুই নেতার কর্মী ও সমর্থকরা মোহনকে খুঁজতে গিয়ে তার বাড়ীতে প্রবেশ করে দরজা, জানালা সহ আসবাবপত্র ভাংচুর চালায়। এমন ঘটনার সংবাদ পেয়ে ফতুল্লা থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী ও হাজী তৈয়াবুর রহমান সহ বিএনপি ও অঙ্গ- সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থলে পৌছে উত্তেজিত নেতা-কর্মী,সমর্থকদের শান্ত করে তাদের কে সেখান থেকে চলে যেতে বলেন।

তবে পরবর্তী সময়ে লুটপাট ও ভাঙচুরের অভিযোগে থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে রুহুল আমিন শিকদার ও রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরীর নাম এসেছে বলে জানা গেছে।
আর এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন রহস্য।
যে ঘটনা এবং যাকে কেন্দ্র করে হামলার সূত্রপাত বলে দাবি করা হচ্ছে, সেই ঘটনায় আলোচিত ব্যক্তির নাম লিখিত অভিযোগে না থাকার কারণ কী? অন্যদিকে রুহুল আমিন শিকদার ও রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরীকেই কেন অভিযোগের আওতায় আনা হলো?
অভিযোগপত্রে রুহুল আমিন শিকদার ও রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরীর নাম থাকলেও অন্য কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করার বিষয়টিও স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

হামলার পর ঘটনাস্থলে শীর্ষ নেতারা


হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী, থানা বিএনপির আরেক শীর্ষ নেতা হাজী তৈয়াবুর রহমানসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতা ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
এ সময় রুহুল আমিন শিকদার ও আনিছুর রহমানের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলে উপস্থিত নেতারা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং তাদের ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেন বলে জানা গেছে।
তবে হামলার আগে কার সঙ্গে কার যোগাযোগ হয়েছিল, ঘটনাস্থলে কারা উপস্থিত ছিলেন এবং হামলার পর কারা কী ভূমিকা পালন করেছেন—এসব প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।


পূর্বপরিকল্পিত হামলা—উঠছে এমন অভিযোগও---

একাধিক সূত্রের দাবি, রামারবাগের ঘটনাটি নিছক আকস্মিক কোনো সংঘর্ষ নয়; এর পেছনে পূর্বপরিকল্পনা থাকতে পারে।
সূত্রগুলোর অভিযোগ, হামলায় সরাসরি অংশ না নিয়ে নেপথ্যে থেকে কেউ কলকাঠি নাড়তে পারেন। স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী এমন কোনো ‘মাস্টারমাইন্ড’ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিপক্ষকে দমিয়ে রাখতে বিভিন্ন ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছেন কি না—তা নিয়েও এখন আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো  প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। 
 ফলে বিষয়টি নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।


আওয়ামী লীগ আমল থেকে বর্তমান—একই ছকের অভিযোগ?------

অনুসন্ধানে আরও একটি পুরোনো অভিযোগ সামনে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র দাবি করেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও সরকারি তোলারাম কলেজকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকে বিভিন্ন সময়ে হামলার শিকার হতে হয়েছিল। সূত্রটির দাবি, শাহজাহান, আতাই রাব্বিসহ কয়েকজন ছাত্রদল নেতাকে কলেজের ভেতরে ও পাশ্ববর্তী  সড়কে মারধরের ঘটনা ঘটেছিল।
সূত্রটির আরও দাবি, এসব ঘটনার ক্ষেত্রে একটি বিষয় ‘কাকতালীয়ভাবে’ অভিন্ন ছিল—হামলার পর একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ভুক্তভোগীকে হামলাকারীদের হাত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতেন।
পুরোনো এসব ঘটনার সঙ্গে বর্তমান রামারবাগের ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এর পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো  প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
 ফলে এই দাবিগুলোকে আপাতত অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

‘মাস্টারমাইন্ড’ নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ-----


স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি পর্দার আড়ালে থেকে প্রতিপক্ষকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন হামলা, মারধর ও লাঞ্ছনার ঘটনায় ওই ব্যক্তির নাম নিয়ে দলীয় পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।
এমনকি ওই ব্যক্তির নিকটাত্মীয়ের ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টিও নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছে।
তাদের অভিযোগ, বিষয়গুলো দলীয় শীর্ষ পর্যায়ের অনেকেরই জানা থাকলেও রহস্যজনক কারণে কার্যকর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আর ব্যবস্থা না নেওয়ার সুযোগে ওই ব্যক্তি দিন দিন আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন এবং জেলা ও থানা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে ফতুল্লার বিএনপি----------


রামারবাগের হামলার ঘটনায় এখন সামনে এসেছে একাধিক প্রশ্ন"
হামলার আগে মোহন কার সঙ্গে বারবার ফোনে যোগাযোগ করছিলেন?
ওই যোগাযোগের সঙ্গে হামলার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না?
হামলার ঘটনা কি পূর্বপরিকল্পিত ছিল?
ঘটনার সূত্রপাত যদি আনিছুর রহমানকে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে, তাহলে লিখিত অভিযোগে তার নাম নেই কেন?
রুহুল আমিন শিকদার ও রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরীকেই কেন অভিযোগের আওতায় আনা হলো?
পর্দার আড়ালে থেকে কেউ হামলায় ইন্ধন দিয়েছেন কি না?
পুরোনো হামলা ও বর্তমান ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি?
দলীয় শীর্ষ পর্যায়ে অভিযোগ থাকার পরও কেন আগে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে আসল রহস্য
রামারবাগের ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোনের কললিস্ট, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, লিখিত অভিযোগের তথ্য এবং পুলিশের তদন্ত।
এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হলে হামলার আগে ও পরে কারা সক্রিয় ছিলেন, হামলাটি আকস্মিক নাকি পরিকল্পিত ছিল এবং এর পেছনে কোনো তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা ছিল কি না—তা অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।

এদিকে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, দলীয় কোন্দল কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে কোনো পক্ষ যেন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সহিংসতায় জড়াতে না পারে। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দলীয় নেতৃত্ব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রত্যাশাও তাদের।
রামারবাগের হামলা তাই এখন শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পুরোনো বিরোধ, অভিযোগপত্রের অসঙ্গতি এবং কথিত নেপথ্য শক্তির ভূমিকা—যার প্রকৃত উত্তর মিলবে কেবল নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও তদন্তে।