দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা, হামলা আর গ্রেপ্তার আতঙ্কের দিনগুলোতে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতি যখন ছিল চরম অনিশ্চয়তায়, তখন রাজপথ ছাড়েননি একদল নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মী। বাড়িঘর ছাড়া হওয়া, কারাবরণ কিংবা রাজপথের লড়াই ছিল তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
অথচ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।
সুদিনের সুবিধাবাদী এবং দীর্ঘদিন বিদেশে বা আত্মগোপনে থাকা, এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীদের সাথে আঁতাতকারী নেতাদের দাপটে এখন অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন দুঃসময়ের সেই ত্যাগী নেতা-কর্মীরা।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আধিপত্য বিস্তার ও প্রভাববলয় সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি বর্তমানে স্পষ্টভাবে একাধিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। নেতৃত্বের এই মুখোমুখি অবস্থান ও দ্বন্দ্বে সিদ্ধিরগঞ্জ, বন্দর ও শহর এলাকার সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে মরিয়া হয়ে ওঠায় চরম হতাশায় ভুগছেন সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা।
গত ৫ আগস্টের পর থেকে নারায়ণগঞ্জজুড়ে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একাংশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা দখল, পরিবহন স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের একাধিক খবর শিরোনাম হয়েছে। দখলদারিত্বের এই লড়াইয়ে ইতিমধ্যেই সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে, যা দলের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে সুসময়ে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করা একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, যাদের বড় অংশকেই আন্দোলনের কঠিন সময়ে রাজপথে দেখা যায়নি। এমনকি তারা বিএনপি করলেও ছিলেন না সক্রিয়। সেই সময়ে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীনদের সাথে সখ্য রেখে করেছেন নানা ব্যবসা-বাণিজ্য; এমনকি অনেকে তাদের সাথে আঁতাত করে জনপ্রতিনিধিত্ব ও নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন।
এর মধ্যে উঠে এসেছে কয়েকজন সাবেক কাউন্সিলর, উপজেলা চেয়ারম্যান ও প্রভাবশালী নেতাদের নাম।
নেতাকর্মীরা জানান, এর মধ্যে একজন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সেলিম ওসমানের সাথে সখ্যতা রেখে হয়েছিলেন জনপ্রতিনিধি। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে কটূক্তি করার সময় মুচকি হেসেছিলেন। এমনকি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কাজ করার। গত বছর তাকে বন্দরে হামলা করে বিবস্ত্র করে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে সাবেক এই উপজেলা চেয়ারম্যান বলয়ের অভিযোগ, বিএনপির দুঃসময়ে অনেক প্রবীণ নেতা অসুস্থতার কথা বলে বাড়িতে বসে ছিলেন, ছিলেন না কোনো দলীয় প্রোগ্রামে, মিছিল-মিটিংয়ে। সেই প্রবীণ নেতার পুত্রকে কাউন্সিলর হয়ে একই মঞ্চে সেলিম ওসমানের সাথে দেখা যেত। তারা বিএনপির রাজনীতি করলেও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীদের সাথে ওঠাবসা ছিল, যা তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করে।
সেই সাথে আলোচনায় আছেন শহরের সাবেক ছাত্রদল সভাপতি ও বিএনপি নেতা। তাকে ঘিরে মহানগরের শীর্ষ নেতাকর্মীদের অভিযোগ রয়েছে, তাদের মতে, গত ১৭ বছরে কোনো ধরনের মিছিল-মিটিং অথবা কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায়নি। সে বিদেশে পলাতক ছিল, কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার পতনের কিছুদিন আগে গ্রেপ্তার হয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জেল থেকে বের হয়ে আসে এবং দলকে বিভক্ত করে বলয় তৈরি করে। সম্প্রতি এ বিষয়ে মন্তব্য করেন বিএনপির এক শীর্ষ নেতা। তিনি বলেন, আলোচিত এই নেতার বিএনপিতে কোনো ভূমিকা নেই এবং স্লপদ-পদবিতেও নেই।
অন্যদিকে বিএনপির মহানগর কমিটির এক যুগ্ম আহ্বায়কের বিরুদ্ধে নেতাকর্মীদের একাংশ ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, গত ১৭ বছরে তাকে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামের রাজপথের কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। কিন্তু তিনি আড়াইহাজারের এমপির আশীর্বাদে ৫ তারিখের পর প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। সেই সাথে বর্তমানে স্ট্যান্ড ইজারা নেওয়াসহ দলীয় বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করছেন।
অভিযোগ রয়েছে শহরের প্রাণকেন্দ্রে থাকা এক কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে। নেতাকর্মীরা জানান, তিনি দুঃসময়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেও সখ্য রেখেছেন ওসমান পরিবারের সাথে। তাদের কথায় করতেন বিভিন্ন কাজকর্ম, এমনকি নিয়েছেন সেই ক্ষমতাসীন নেতাদের থেকে বিভিন্ন সুবিধা। বর্তমানে তিনি বড় বিএনপি নেতা বনে গেছেন।
সম্প্রতি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কে আছেন নাসিকের সংরক্ষিত আসনের সাবেক এক নারী কাউন্সিলর। তাকে নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে জানান, এই নারী কাউন্সিলর বিএনপির দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র আইভীর সাথে ছিলেন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে। ছিলেন না দলের কোনো কর্মসূচিতে। তার বিষয়ে যুবদল নেতা রাফি উদ্দিন রিয়াদ সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিযোগ করেন, তিনি বিএনপি করলেও চেয়েছেন নৌকায় ভোট। অথচ তিনি দুঃসময়ে কোনো বিএনপির পরিচয় দিতেন না। এমনকি যেতেন ১৫ আগস্টের শোক দিবসের প্রোগ্রামে। এমনকি কার আশকারায় সামনের সারিতে আসতে চান সাবেক এই কাউন্সিলর—সেই প্রশ্ন রাখেন এই যুবদল নেতা।
এছাড়াও এর মধ্যে অনেকেই এখন দলের সুবিধাজনক সময়ে দলীয় কোন্দল এবং নানা প্রভাব সৃষ্টি করে সামনের সারিতে চলে এসেছেন। যাদের মধ্যে অনেকে দলের বিশাল অংশকে পাশ কাটিয়ে আলাদাভাবে সভা-সমাবেশ করে নিজেদের বলয়কে শক্তিশালী করছেন। যার পেছনে রয়েছে বিএনপির জেলা ও মহানগরের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সমর্থন।
অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সুবিধাবাদীদের দাপটে টিকতে না পেরে রাজপথের অনেক পরীক্ষিত নেতা বাধ্য হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে একাধিক নেতা জানান, যারা জেল-জুলুম সহ্য করে দল ধরে রেখেছিলেন, বিভাজনের রাজনীতির কারণে আজ তারা গুরুত্বহীন। আবার টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে নেমে অনেক ত্যাগী নেতাও পারিপার্শ্বিক প্রভাবে পড়ে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কে জড়িয়ে দীর্ঘদিনের সুনাম হারাচ্ছেন।
তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মতে, ত্যাগীদের পেছনে ঠেলে সুবিধাবাদীদের এই পুনর্বাসন এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য বড় বাধা। অবিলম্বে কেন্দ্রীয় হাই কমান্ড থেকে কার্যকর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, এসব নেতার চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং পরীক্ষিত নেতাদের যোগ্য মূল্যায়ন না করা হলে ঐতিহ্যবাহী এই রাজনৈতিক ঘাঁটিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব সংকট তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে পরিস্থিতি মূল্যায়নে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো রাজনৈতিক দল দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর ক্ষমতার সুবিধাজনক জায়গায় এলে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
নারায়ণগঞ্জের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, আন্দোলনের কাণ্ডারিদের মূল্যায়নের চেয়ে সুযোগ সন্ধানীদের উত্থান বেশি ঘটেছে। দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি এবং নেতাদের কোন্দলে তৃণমূলে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। কেন্দ্রীয় হাই কমান্ড যদি দ্রুত এসব থামিয়ে ত্যাগীদের সামনে না আনে, তবে এ ধরনের রাজনৈতিক বিভাজন দলটির দীর্ঘমেয়াদি ভাবমূর্তি ও নেতৃত্বের ভিত্তিকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলবে।


































