নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

বুধবার,

০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঝড়ের পরে

ডা: গাজী খায়রুজ্জামান

প্রকাশিত:২২:০০, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঝড়ের পরে

ঝড় যতই উন্মত্ত হোক, একদিন তার ক্লান্তি আসে,

কালো মেঘের রাজপ্রাসাদ ভেঙে আলো নামে ঘাসে।

রাত যতই দীর্ঘ হোক, ভোরকে যায় না ঠেকানো,

দিগন্তের ওপার থেকে সূর্যকেও যায় না লুকানো।

 

যে মেঘ আজ আকাশজুড়ে আঁকে ভয়ের ক্যানভাস,

তার বুকেই লুকানো থাকে বৃষ্টির মধুর আভাস।

যে রাতটাকে মনে হয়—ফুরোবে না আর,

তার বুক চিরেই ফুটে ওঠে সোনালি সকাল।

 

হয়তো বা বীজটাকে দেখো—মাটির নিচে নিঃশব্দ ঘুটঘুটে অন্ধকার কারাগারে বন্দি,

তবুও সে স্বপ্ন বুনে চলে সেই মাটির কারাগারে।

মাটির চাপকে ভয় না পেয়ে শিকড় বাড়ায় ধীরে,

একদিন সে কারাগার ভেঙে আলোর ধরায় ফিরে।

 

শুকনো ডাল দেখে ভেবো না—বসন্ত বুঝি মরে,

নীরব বৃক্ষ গোপনে তখন ফুলের স্বপ্ন বুনে।

পাতাঝরা সেই বৃক্ষ যেন পরাজিত কোনো প্রাণ,

অথচ বসন্ত এলে তারই ডালে জাগে ফুলের গান।

 

নদীর পথে পাথর এলে নদী কি কখনো থামে?

সে তো নিজের পথটি খোঁজে পাথরেরই বাঁকে বাঁকে।

পাহাড় যদি প্রাচীর হয়ে রোধ করে তার গতি,

স্রোত তখন বাঁক নেয় শুধু—সাগর ছোঁয়ার তরে।

 

পথের বুকে কাঁটা যদি রক্তের দাগ আঁকে,

মনে রেখো, গোলাপ কিন্তু কাঁটার পাশেই থাকে।

যে পায়ে আজ ক্ষতের জ্বালা, কাল সে পায় ডানা,

দিগন্ত তখন হাতছানি দেয়—"উড়ে এসো আপন ঠিকানায়।"

 

ঝড় এলে মহীরুহও কখনো নুয়ে পড়ে নিচে,

তবুও নতুন ডালে ফুল ফুটাবার স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে।

তাই শেকড় আরও গভীর করে আঁকড়ে ধরে মাটি,

বসন্ত এলেই ফুলের গানে হাওয়ায় দোলে দেহ-ডাল।

 

আকাশ যখন ঘন মেঘে অন্ধকারে ঢাকে,

পাখি তখনও গান গেয়ে যায় নীল আকাশের ডাকে।

ঝড়ের আঘাত ডানায় যদি ক্ষতের দাগও আনে,

তবুও ভাঙা ডানায় স্বপ্ন থাকে—আকাশ ছোঁয়ার টানে।

 

ঝড় যদি বারবার মাটির কাছে নিয়ে যায় তোমায়,

মনে রেখো—বীজও কিন্তু মাটিতে পড়েই অঙ্কুর গজায়।

পড়ে যাওয়ার মানে এই নয় যে পথের প্রদীপ নিভে যাওয়া,

পড়ে যাওয়াই হতে পারে—বীজের মতো নতুন জীবনের অঙ্কুর গজানো।

 

যে অশ্রু আজ গড়িয়ে পড়ে নীরব রাতের কোলে,

কাল সে অশ্রুই মুক্তো হয়ে হাসবে সকালরোদে।

যে ক্ষত আজ বুকের মাঝে বিষণ্ন নদী বইয়ে দেয়,

সময় তারই তীরে একদিন ফুলের বাগান গড়ে দেয়।

 

বন্ধ দরজা দেখে যদি পথিক থেমে যায়,

দিগন্ত তখন অন্য পথে নতুন দুয়ার খুলে দেয়।

একটি স্বপ্ন ভেঙে গেলেই আকাশ ভেঙে পড়ে না,

একটি নৌকা ডুবলেই তো আর নদীর স্রোত মরে না।

 

তাই ঝড় এলে ভয় পেয়ো না, মেঘকে হতে দাও ভারী,

বৃষ্টির শেষেই রংধনু হাসে বিশাল আকাশজুড়ে।

আজ যে আকাশ বিদ্যুতে কাঁপে, কাল সে নীল হবেই,

আজকের এই অশ্রুবিন্দু কাল হাসির ফুল ফুটাবেই।

 

যে মানুষটি ঝড়ের রাতে প্রদীপ হাতে হাঁটে,

সে-ই তো সকালের প্রথম আলো দেখতে পায় প্রভাতে।

যে আগুনে পুড়ে পুড়ে হলো ছাই, তবু স্বপ্ন রাখে বুকে,

তার স্বপ্ন একদিন সত্যি হয়ে ফিরে আসে তারই সুখে।

 

তাই পড়ে গেলে উঠো আবার, ধুলো মুছে দাঁড়াও,

হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো বুকের মাঝে জড়াও।

ভাঙা ডানায় আকাশ মাপো, দিগন্ত ছুঁয়ে যাও—

মনে রেখো, রাত পোহালেই নতুন ভোরের সূর্য জাগে।

 

চলার পথে যত ঝড় আসে আসুক, বুকের প্রদীপ নিভিও না,

মেঘের আড়াল দেখে কখনো সূর্যের অস্তিত্ব ভুলিও না।

আজ যদি পথ অন্ধকার হয়, তবু থেমে যেয়ো না—

রাত যতই গভীর হোক, ভোর আসবেই; ভয় পেয়ো না।

 

কারণ ঝড়েরও শেষ আছে, রাতেরও আছে অবসান,

অন্ধকারের বুকেই জন্ম নেয় আলোর নতুন গান।

তাই বুকের ভেতর স্বপ্ন রাখো, চোখে রাখো প্রভাত—মনে রেখো—ঝড়ের পরেই সূর্য ওঠে, আর অন্ধকার পেরিয়ে আলো ঠিকই ফিরে আসে।

সম্পর্কিত বিষয়: