নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

শুক্রবার,

২১ আগস্ট ২০২৬

বন্দরে দুর্ধর্ষ সিফাত বাহিনীর অপরাধ চিত্র: পুলিশের ওপর হামলা থেকে বুলবুল হত্যা

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:২১:৪৬, ২১ আগস্ট ২০২৬

বন্দরে দুর্ধর্ষ সিফাত বাহিনীর অপরাধ চিত্র:  পুলিশের ওপর হামলা থেকে বুলবুল হত্যা

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে শেখ সিফাত ওরফে ‘কাটা সিফাত’ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, হামলা ও ডাকাতির অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ ইসলামী যুব আন্দোলনের নেতা জাহিদ আল আমিন বুলবুলকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় সিফাতসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

 

বুলবুল হত্যাকাণ্ডের পর সিফাত বাহিনীর বিরুদ্ধে পুরোনো অভিযোগগুলোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শাহী মসজিদ, সালেহনগর, খালপাড়, বউবাজার, নূরবাগ, হাফেজীবাগ কলোনী, বাড়ইপাড়া ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের দাপট চলে আসছে।

 

তবে এসব অভিযোগের সবগুলো আদালতে প্রমাণিত নয়। সংশ্লিষ্ট মামলা ও অভিযোগের ভিত্তিতেই এসব তথ্য উঠে এসেছে।

 

পুলিশের ওপর হামলা, অস্ত্র লুটের অভিযোগ

 

সিফাত বাহিনীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোর একটি পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা।

২০২৬ সালের মে মাসে বন্দর এলাকায় ৯৯৯-এর কলে সাড়া দিতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মদনগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই সোহেল রানা বাদী হয়ে শেখ সিফাত, সোহান ও ইমনসহ ২৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উঠে আসে।

পুলিশের ওপর হামলা করে অস্ত্র লুটের মতো ঘটনায় মামলা হওয়ার পরও সিফাত ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে নতুন করে অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।

এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরেও বন্দরে পুলিশকে মারধর করে হাতকড়াসহ এক আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় শেখ সিফাত গ্যাংয়ের নাম সংবাদে আসে।

 

মে মাসে ১০ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ

২০২৬ সালের ২১ মে বন্দর শাহী মসজিদ-বউবাজার এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে চলন্ত মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে এক সাবেক কাউন্সিলরের ছেলেকে কুপিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে সিফাত বাহিনীর বিরুদ্ধে।

ঘটনার পর পুলিশ ও ডিবির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে সিফাত বাহিনীর আস্তানায় অভিযান চালিয়ে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের কথাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

জুনে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ

এরপর জুন মাসেও সিফাত ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। পুলিশের কাছে সিফাত পলাতক থাকলেও তার সহযোগীরা এলাকায় তৎপর রয়েছে—এমন তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল হোতা সিফাত আত্মগোপনে থাকলেও তার সহযোগীরা এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল।

 

ঢালী বিরিয়ানি হাউজে চাঁদা দাবি ও লুটের অভিযোগ

আপনার দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, ১৭ মে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বন্দর রেললাইন এলাকার ‘ঢালী বিরিয়ানি হাউজে’ শেখ সিফাতের নেতৃত্বে ৪ থেকে ৫ জন অস্ত্রধারী প্রবেশ করে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে।

দোকানের মালিক রাজু ঢালীর অভিযোগ, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সন্ত্রাসীরা কর্মচারীদের মারধর করে এবং ক্যাশ বাক্স ভেঙে ২ লাখ ২২ হাজার ২১০ টাকা নিয়ে যায়।

ঘটনায় বন্দর থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানান দোকান মালিক।

রাজু ঢালীর ভাষ্য, পুলিশের ওপর হামলার পর সিফাত বাহিনীর সদস্যরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন।

২০২৩ সাল থেকেই নানা অভিযোগ

সিফাতের বিরুদ্ধে অভিযোগের ইতিহাস নতুন নয়। ২০২৩ সালের একটি পুলিশি মামলার তথ্য অনুযায়ী, বন্দর থানার নবীগঞ্জ কদমতলী এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতির সময় দেশীয় অস্ত্রসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় শেখ সিফাত ওরফে কাটা সিফাতকে পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করে মোট নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলাটির নম্বর ছিল ৩৪(৫)২৩ এবং ধারাগুলো ছিল দণ্ডবিধির ৩৯৯/৪০২।

 

হামলা ও চাঁদাবাজির পুরোনো অভিযোগ

২০২৩ সালের বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে সিফাত ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে একাধিক হামলা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির অভিযোগের কথা উঠে আসে।

এর মধ্যে বন্দর শাহী মসজিদ এলাকায় এক যুবলীগ নেতাকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে জখম করার অভিযোগে মামলা, ব্যবসায়ীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা নেওয়া, সালেহনগর এলাকায় এক ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে চাঁদা দাবি এবং স্থানীয় কয়েকজনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ রয়েছে।

একটি মামলায় বাড়ইপাড়া এলাকার রুহিত নামে এক হোসিয়ারি শ্রমিককে কুপিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ করা হয়। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসা পরিবারের সদস্যদেরও হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় বন্দর থানায় মামলা করা হয়েছিল বলে পুরোনো প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

২০২৪ সালে চাঁদা না পেয়ে হামলার অভিযোগ

২০২৪ সালের অক্টোবরেও কলাগাছিয়া এলাকায় পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে দুই ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে শেখ সিফাত ও অনিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই ঘটনায় স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের দুই ভাতিজাকে হামলার শিকার করার অভিযোগ ওঠে।

 

২০২৫ সালে ইসলামী আন্দোলনের নেতার ওপর হামলার অভিযোগ

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বন্দর শাহী মসজিদ এলাকায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সহ-সভাপতি মো. নূর হোসেনকে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগও ওঠে শেখ সিফাত ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।

ওই ঘটনার প্রতিবেদনে বলা হয়, এর আগে শাহী মসজিদ-খালপাড় এলাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল। নূর হোসেন অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরার পর তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়দের দাবি ছিল।

২০২৬ সালের মে: পুলিশের ওপর হামলার পরও তৎপরতা

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে সিফাত বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন আরও গুরুতর হয়েছে। একদিকে পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি অস্ত্র লুটের মামলা, অন্যদিকে সাধারণ ব্যবসায়ী ও মানুষের কাছ থেকে চাঁদা ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে বন্দরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মে মাসে সাবেক কাউন্সিলরের ছেলেকে কুপিয়ে টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগের পর পুলিশ অভিযান চালালেও জুন মাসে আবার চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে।

এবার বুলবুল হত্যা

এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই ২০ আগস্ট রাতে বন্দরের সালেহনগর এলাকায় ইসলামী যুব আন্দোলন নেতা জাহিদ আল আমিন বুলবুলকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বুলবুলের সঙ্গে শেখ সিফাত ও তার সহযোগীদের পূর্ববিরোধ ছিল। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের খাবার সরবরাহের বিষয়কে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয় বলে পুলিশ জানায়।

পরবর্তী সময়ে বুলবুলের ইজিবাইক গ্যারেজে হামলা ও প্রায় ১৮ লাখ ১৭ হাজার টাকার মালামাল লুটের অভিযোগে মামলা হয়। ওই মামলায় শেখ সিফাতসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছিল।

পুলিশের দাবি, ওই মামলার জের ধরেই বুলবুলকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।

২০ আগস্ট রাতে সালেহনগর এলাকায় বুলবুলের পথরোধ করে ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল তাকে ধারালো অস্ত্র, রামদা, চাপাতি, চাকু ও লোহার পাইপ দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

 

হত্যার পর রাতেই ১১ গ্রেপ্তার

বুলবুল হত্যার পর রাতেই অভিযান চালিয়ে শেখ সিফাতসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—শেখ সিফাত, জুম্মন ওরফে হোয়াইট জুমান, মাহবুব হোসেন ওরফে মাহফুজ, রিয়াদ, মো. সিয়াম, মোসা. মিনারা, নাসিমা, রুমা, ইফরান, ইয়াসমিন ও সিজান ওরফে জিসান।

পুলিশ জানিয়েছে, শেখ সিফাতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে ১৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। জুম্মনের বিরুদ্ধে ৯টি এবং রিয়াদের বিরুদ্ধে ৪টি মামলা রয়েছে।

হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্র ও একটি ওয়াকিটকিও উদ্ধার করা হয়েছে।

বুলবুল হত্যার পর সামনে পুরোনো অভিযোগগুলো

বুলবুল হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে এত অভিযোগ ও মামলা থাকার পরও কীভাবে একটি এলাকায় তার প্রভাব এতটা বিস্তৃত হলো?

স্থানীয়দের অভিযোগ, সিফাত বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় অস্ত্র নিয়ে মহড়া, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও হামলা চালিয়ে আসছে। ভয় ও প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেকে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতেও সাহস পান না বলে তাদের দাবি।

তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনার সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় আদালতের বিচার ও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

 

প্রশাসনের কাছে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি

বন্দরবাসীর দাবি, শুধু বুলবুল হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার করলেই হবে না; সিফাত বাহিনীর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও মামলাগুলো দ্রুত তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে এলাকায় অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ, চাঁদাবাজি ও ছিনতাই নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সাম্প্রতিক বুলবুল হত্যাকাণ্ডের পর ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী যুব আন্দোলনও সিফাতসহ জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, বুলবুল হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সিফাতের বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য অভিযোগ ও মামলার বিষয়ও আইন অনুযায়ী তদন্ত ও পর্যালোচনা করার সুযোগ রয়েছে।

এখন মূল প্রশ্ন—বুলবুল হত্যার বিচার কত দ্রুত এগোয় এবং সিফাত বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলোর তদন্ত ও বিচারিক নিষ্পত্তি কতটা কার্যকরভাবে করা যায়।