নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

শনিবার,

১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিএনপিকে ডুবাতে গিয়ে তলিয়ে গেলেন তাঁরা

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:২০:৫৬, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিএনপিকে ডুবাতে গিয়ে তলিয়ে গেলেন তাঁরা

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একসময় বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী মুখ ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, আতাউর রহমান খান আঙ্গুর,  অধ্যাপক রেজাউল করিম ও মোহাম্মদ শাহ আলম। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলীয় পদ-পদবি ও নিজস্ব অনুসারী সব মিলিয়ে চারজনেরই ছিল আলাদা রাজনৈতিক বলয়। স্থানীয় রাজনীতিতে তাদের প্রভাবও ছিল দৃশ্যমান।

কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে নির্বাচনে নামার পর সেই অবস্থানেই বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিলেন তারা। 
দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে বিএনপিকে চাপে ফেলার যে রাজনৈতিক হিসাব করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই হিসাবেই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে। এখন তারা দলীয় পরিচয়হীন, সাংগঠনিকভাবে বিচ্ছিন্ন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক মাঠেও অনেকটাই পর্দার আড়ালে। 

আগে যাদের ঘিরে নেতাকর্মীদের ভিড় দেখা যেত, এখন তাদের প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা কিংবা অনুসারীদের সরব উপস্থিতিও তেমন চোখে পড়ে না।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে সবচেয়ে আলোচিত বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে গিয়াস উদ্দিন ও শাহ আলমকে ঘিরে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে দুজনই স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। একইভাবে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামেন সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খান আঙ্গুর। আর নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম।
দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় চারজনকেই বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।

ফলে একসময় বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এই চার নেতার এখন আর দলের কোনো সাংগঠনিক পরিচয় নেই। যে দলের রাজনীতিকে ভিত্তি করে তারা দীর্ঘদিন নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছিলেন, সেই দলেই এখন তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ নন।

নির্বাচনের সময় চার নেতার অনুসারীদের মধ্যে প্রত্যাশা ছিল ব্যাপক কিন্তু ফলাফল সেই হিসাবকে ভিন্ন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়। চারজনই পরাজিত হন। গিয়াস উদ্দিন নারায়ণগঞ্জ-৩ ও ৪ দুই আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামানত হারান। তিনবারের সাবেক এমপি আঙ্গুরও দলীয় প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হন। শাহ আলম উল্লেখযোগ্য ভোট পেলেও জয় থেকে দূরে থাকেন। আর চারবারের সাবেক এমপি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিমের ফল হয় আরও হতাশাজনক; তিনিও জামানত হারান।

তবে নির্বাচন শেষ হওয়ার এতদিন পর এখন তাদের ভোটের হিসাবের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক মাঠের চিত্র। নির্বাচনের আগে যাদের ঘিরে কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি, রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যেত, এখন দৃশ্যমানতা নেই বললেই চলে। 
দলীয় রাজনীতির মূল স্রোত থেকে তারা কার্যত বাইরে। জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তাদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, তাঁদের অনুসারীরাও এখন অনেকটা ব্যাকফুটে। একসময় যারা নিজ নিজ নেতার পক্ষে প্রকাশ্যে সরব ছিলেন, তাদের অনেককেই এখন আর সেই ভূমিকায় দেখা যায় না। 
কেউ কেউ বিএনপির মূলধারার সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মিলিয়ে নিয়েছেন। ফলে চার নেতাকে ঘিরে একসময় যে পৃথক রাজনৈতিক বলয় ছিল, তার দৃশ্যমান শক্তিও অনেকটাই কমে গেছে।

গিয়াস উদ্দিনের পতন সবচেয়ে আলোচিত
চার নেতার মধ্যে মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের রাজনৈতিক ছন্দপতন সবচেয়ে বেশি আলোচিত। একসময় জাতীয় পাটি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা গিয়াসউদ্দিন ৯০’র গণআন্দোলনে এরশাদের পতনের পর আওয়ামীলীগের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে  যুক্ত হন। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের টিকিট না পেয়ে নিস্ক্রীয় হয়ে পড়েন। এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চুড়ান্ডের শেষ মুহুর্তে নাটকীয়ভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন বাগিয়ে দেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমানকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

এরপর নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন গিয়াস উদ্দিন। ২০২২ সালে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এবং পরের বছর সভাপতি হয়ে তিনি জেলার সাংগঠনিক রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছান। অর্থাৎ দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে দলের ভেতরেই তাঁর এমন একটি অবস্থান তৈরি হয়েছিল, যা তাঁকে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির অন্যতম ক্ষমতাবান নেতায় পরিণত করেছিল। 

 সেই গিয়াস উদ্দিনই এবার দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে একসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-৩ ও ৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। দলীয় সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচনে যাওয়ার পর বহিষ্কৃত হন। দুই আসনে প্রার্থী হয়েও জয় তো পানইনি, বরং দুই জায়গাতেই জামানত হারিয়েছেন।

কিন্তু গিয়াস উদ্দিনের পতন শুধু নির্বাচনী পরাজয়ে সীমাবদ্ধ নেই। জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে এখন তিনি দলের প্রাথমিক সদস্যপদহীন একজন সাবেক নেতা। নির্বাচনের আগে তাকে ঘিরে যে কর্মী-সমর্থকদের সরব উপস্থিতি ছিল, সেটিও এখন অনেকটাই অতীত। তার অনুসারীদের বড় একটি অংশও প্রকাশ্য রাজনীতিতে আগের মতো সক্রিয় নয়। ফলে একসময় যে রাজনৈতিক বলয়কে তিনি নিজের শক্তি হিসেবে দেখিয়েছিলেন, বর্তমানে সেই বলয়ের দৃশ্যমান অনেকটাই ক্ষীণ। সেইসাথে দূরে সরে গেছেন তার থেকে সুবিধা নেওয়া অনেকে। 

তিনবারের এমপি আঙ্গুরও এখন আড়ালে

আঙ্গুরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তবতা। আড়াইহাজারের রাজনীতিতে একসময় বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন তিনি। নারায়ণগঞ্জ-২ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ডও রয়েছে তাঁর। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া এবং দলীয় প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার পর আড়াইহাজারের রাজনীতিতে তিনি ও তার অনুসারীরাও কার্যত হারিয়ে গেছেন। 

শাহ আলমের প্রায় দুই দশকের পথও বদলে গেল
মোহাম্মদ শাহ আলমের রাজনৈতিক পরিচয়ের বড় অংশ বিএনপিকে ঘিরে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগের সারাহ বেগম কবরীর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে মাত্র ২ হাজার ৩৮৯ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন তিনি। সেই নির্বাচন থেকেই আসনটির রাজনীতিতে তাঁর আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়। পরে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদেও ছিলেন। কিন্তু এবার দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে জোটের প্রার্থীর পক্ষে না থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শাহ আলম। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় বহিষ্কৃত হন। নির্বাচনে প্রায় ৩৯ হাজার ভোট পেলেও জয়ী হতে পারেননি। শাহ আলমের বিদ্রোহের কারণে বিএনপির ভোটে বিভাজন তৈরি হয়েছিল এমন আলোচনা তখন ছিল। শেষ পর্যন্ত বিএনপি-সমর্থিত জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীও পরাজিত হন। সেই সুযোগে জয় পান এনসিপির আব্দুল্লাহ আল আমিন।
তবে নির্বাচনের পর শাহ আলমের রাজনৈতিক তৎপরতাও আগের মতো নেই। ফতুল্লায় তার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত নেতাকর্মীদের অনেককেই এখন আগের মতো প্রকাশ্যে সক্রিয় দেখা যায় না। 

রেজাউল করিমের ছন্দপতন 
রেজাউল করিমের ক্ষেত্রে ছন্দপতনটি আরও বড়। সোনারগাঁয়ের রাজনীতিতে একসময় বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন তিনি। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন থেকে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি বিএনপি সরকারের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও ছিল তাঁর। সেই রেজাউল করিম এবার দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন, দল থেকে বহিষ্কৃত হন এবং নির্বাচনে মাত্র ৪ হাজার ৩২৪ ভোট পেয়ে জামানত হারান। একসময় জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা একজন নেতার জন্য এটি বড় রাজনৈতিক ছন্দপতন হিসেবেই দেখছেন স্থানীয়রা। অনেকে মনে করছেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে এই প্রবীণ নেতা নির্বাচন না করলেও পারতেন। 

এই চার নেতার রাজনৈতিক গল্পের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও শেষ পরিণতিতে রয়েছে বড় মিল। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তারা কেউই দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে সরে দাড়াননি। বরং নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত ভোট ও অনুসারীদের শক্তির ওপর ভরসা করে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।

কিন্তু এখন তাঁরা কেউই বিএনপির আনুষ্ঠানিক অংশ নন। নেই দলীয় পদ, নেই সাংগঠনিক পরিচয়। তাঁদের অনুসারীদের বড় অংশও রাজনৈতিকভাবে সতর্ক হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আগের মতো তাঁদের বলয়ের উপস্থিতি নেই। এমনকি তাদের ঘিরে যে রাজনৈতিক আলোচনা একসময় নিয়মিত ছিল, সেটিও অনেকটাই কমে গেছে।

নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে এর মধ্যে নতুন নেতৃত্ব ও নতুন সমীকরণও তৈরি হয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে থাকা নেতারা ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছেন। বিপরীতে চার বিদ্রোহী নেতা ও তাদের অনুসারীরা অনেকটাই প্রান্তিক অবস্থানে চলে গেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বিষয়টিকে তাই শুধু চার নেতার নির্বাচনী পরাজয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবের পরীক্ষাও। দলীয় সংগঠন ও প্রতীকের বাইরে গিয়ে তারা নিজেদের যে শক্তির ওপর ভরসা করেছিলেন, এখন সেই শক্তির দৃশ্যমানতা এখন অনেকটাই প্রশ্নের মুখে।

একসময় যাদের ঘিরে নেতাকর্মীদের ভিড় থাকত, এখন তাঁদের দেখাই মেলে না এমন মন্তব্যও শোনা যাচ্ছে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে। তাঁদের অনুসারীদেরও অনেকটা ব্যাকফুটে চলে যেতে হয়েছে। ফলে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে চার সাবেক প্রভাবশালী নেতার বর্তমান অবস্থান যেন এক ধরনের রাজনৈতিক শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।