কয়েকদিনের তীব্র সংকটের পর নারায়ণগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা শুরু হলেও শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সরবরাহ ফিরলেও অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকায় ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁ, রূপগঞ্জ, বন্দর ও আড়াইহাজারের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষ করে ডাইং, নিটিং, স্পিনিং ও বয়লারনির্ভর কারখানাগুলোতে সংকটের প্রভাব বেশি পড়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় বয়লার চালানো যাচ্ছে না। কোথাও উৎপাদন সীমিত করা হয়েছে, আবার কোথাও কারখানার কিছু ইউনিট বন্ধ রেখে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে যাওয়ায় নারায়ণগঞ্জের শিল্পখাতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে প্রায় এক হাজার গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০০টি ফতুল্লা বিসিক এলাকায়। অধিকাংশ কারখানাই গ্যাসনির্ভর। গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমে যাওয়ায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কারখানা ছুটিতে রাখা হয়েছিল এবং অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল।
ডাইং থেকে পোশাক কারখানায় প্রভাব
নারায়ণগঞ্জের শিল্পখাতে গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে ডাইং কারখানাগুলোতে। গ্যাসের অভাবে কাপড় রং করা ও ফিনিশিংয়ের কাজ ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো ফেব্রিক্স সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে ডাইং কারখানা থেকে কাপড় না পাওয়ায় গার্মেন্টস কারখানার কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ফলে একটি কারখানার গ্যাস সংকটের প্রভাব ধাপে ধাপে পুরো উৎপাদন শৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ছে। সময়মতো রপ্তানি পণ্য প্রস্তুত ও সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার ধরে রাখা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিকল্প জ্বালানিতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেলচালিত জেনারেটর ও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
দুই সপ্তাহ আগের এক প্রতিবেদনে টিবিএস জানায়, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের একটি স্পিনিং মিল প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে কারখানাটির দৈনিক গ্যাস ব্যয় ছিল প্রায় ২০ লাখ টাকা; গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করতে গিয়ে দৈনিক ব্যয় প্রায় ৯০ লাখ টাকা পর্যন্ত উঠেছে বলে মালিকপক্ষ জানিয়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, গ্যাসের পরিবর্তে ডিজেল বা অন্য জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে।
রূপগঞ্জে গ্যাসের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকটও
রূপগঞ্জসহ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতিও শিল্পকারখানার উৎপাদনকে আরও কঠিন করে তুলছে। গ্যাসের চাপ কম থাকার সময় জেনারেটর চালানোর প্রয়োজন হলেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি ব্যয় শিল্প উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক জাতীয় পর্যায়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাস সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় দেশের স্টিল, সিমেন্ট, কাচ, টেক্সটাইল, ডাইং, স্পিনিং, পোশাক ও নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন কমেছে।
এলএনজি সরবরাহে ঘাটতির প্রভাব
দেশব্যাপী চলমান গ্যাস সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালগুলোতে সরবরাহ বিঘ্নের বিষয়টি উঠে এসেছে। জুলাইয়ে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এর ফলে তিতাস গ্যাসের আওতাধীন আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক ও সিএনজি গ্রাহকদের স্বল্পচাপের সমস্যায় পড়ার কথা জানানো হয়েছিল।
এরপর সংকট আরও তীব্র হয়। ১৪ আগস্ট প্রকাশিত ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (FSRU) গ্যাস সংকটের চতুর্থ সপ্তাহে গিয়ে আবারও সরবরাহ সমস্যায় পড়ে। এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ দেশের বিভিন্ন খাতে পড়ে।
কিছুটা সরবরাহ ফিরলেও স্বস্তি নেই শিল্পে
শনিবারের তুলনায় দেশের কিছু শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করায় বন্ধ থাকা কয়েকটি কারখানা পুনরায় চালু হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে নারায়ণগঞ্জের শিল্প মালিকদের অভিযোগ, সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া এবং প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় উৎপাদন এখনো স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে পারেনি।
অন্যদিকে, ১৬ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সংকটের পর বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং পরিস্থিতির আরও উন্নতির চেষ্টা চলছে। ফলে আবাসিক পর্যায়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও শিল্পকারখানাগুলোতে চাপ ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের বিষয়টি এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
শ্রমিকদের আয়েও পড়ছে প্রভাব
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শুধু কারখানা মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের ওপরও। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় ওভারটাইম কমে গেছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হচ্ছে।
উৎপাদন দীর্ঘদিন কম থাকলে শ্রমিকদের আয় কমে যাওয়া, বেতন-ভাতা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিল্প উদ্যোক্তারাও বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সংকট দীর্ঘ হলে রপ্তানিতে ঝুঁকি
নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিটওয়্যার ও টেক্সটাইল শিল্পাঞ্চল। ফলে এখানকার গ্যাস সংকট শুধু স্থানীয় শিল্প উৎপাদন নয়, দেশের রপ্তানি খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিকেএমইএর পক্ষ থেকে এরই মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বাড়তি ব্যয় এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে সরকারের কাছে সহায়তার দাবি জানানো হয়েছে। শিল্প খাতে নগদ প্রবাহের চাপ বাড়ায় জুলাই ও আগস্টের বকেয়া বিল পরিশোধে বিশেষ কিস্তি সুবিধার দাবিও জানানো হয়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি, সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো নয়, বরং শিল্পকারখানার প্রয়োজন অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত চাপ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নিতে হবে।
তাদের আশঙ্কা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আদেশ, শ্রমিকের কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক শিল্প অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিকেএমইর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, গ্যাসের সংকট অনেকদিন যাবৎই হচ্ছে। কিন্তু গত ২০/২৫ দিন গ্যাসের যে সংকট দেখলাম, আমার এই ৩৮/৪০ বছরে গার্মেন্টেসের ইতিহাসে এতোবড় গ্যাসের সংকট আমরা ফেস করি নাই।
মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় গত মাসে বললেন, আগস্টের ১০ তারিখ নাগাদ গ্যাস সংকট সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু র্দুভাগ্যজনক হলেও সত্য ১০ তারিখ থেকে একেবারে নাই হয়ে গেছে গ্যাস। এরআগে এক দুই পিএসআর প্রেসার ছিল। দিনে না হলেও রাতে কিছুটা পাওয়া যেত। কিন্তু ১০ তারিখ থেকে একেবারে নাই। এটা কেন হলো কি কারণে হলো আমারা কোনভাবে এর রহস্য উদঘাটন করতে পারছি না। আমরা মাননীয় মন্ত্রীর সাথে বিষয়টি নিয়ে শীঘ্রই বসার চেষ্টা করছি।
তিনি আরও বলেন, গতরাত থেকে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে কিন্তু চাপ কম। স্বাভাবিক হতে হয়তো আরও সময় লাগবে। তবে দ্রুত স্বাভাবিক না হলে পোশাক শিল্পে সংকট ঘনিভুত হবে।


































