নারায়ণগঞ্জের বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সমীকরণে ফাটল এখন প্রকাশ্যে। একসময় ঘনিষ্ঠভাবে রাজনীতি করা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধান এখন মুখোমুখি অবস্থানে।
জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই দূরত্ব মঙ্গলবারের (৬ অক্টোবর) হাতাহাতির ঘটনায় প্রকাশ্যে আসে। আর পরদিন বুধবার (৭ অক্টোবর) বার ভবনে দুই পক্ষের আলাদা অবস্থানে সেই বিভক্তির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনের নিচতলায় সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুসারী আইনজীবীদের একাংশ আলাদাভাবে টেবিলে জড়ো হয়ে অবস্থান নেন। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন এবং বার ভবনের মূলফটকে সাখাওয়াতের অনুসারীদের বিভিন্ন স্লোগান দিতেও দেখা যায়। একই সময়ে অপর পাশে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানের অনুসারী ও তাদের সঙ্গে থাকা আইনজীবীরাও আলাদা টেবিলে বসে নিজেদের অবস্থান জানান দেন।
একদিন আগেও যে বার ভবনে দুই পক্ষের আইনজীবীরা মুখোমুখি হয়ে সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন, পরদিন সেখানে তাদের এভাবে পৃথকভাবে অবস্থান নিতে দেখা যাওয়ায় আদালতপাড়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আইনজীবীদের অনেকে বলছেন, মঙ্গলবারের ঘটনা ছিল দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ বিরোধের প্রকাশ্য বহিঃপ্রকাশ। আর বুধবারের পৃথক অবস্থান সেই বিভক্তিকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত জেলা আইনজীবী সমিতির আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই সাখাওয়াত ও আনোয়ারের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে সমিতিতে নেতৃত্ব, প্যানেল গঠন এবং বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে দুই ধরনের অবস্থান তৈরি হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার বিকেলে জেলা আইনজীবী ভবনের দ্বিতীয় তলায় দুই পক্ষের আইনজীবীরা উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়েন।
ঘটনার সময় সাখাওয়াত হোসেন খান জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবিরের চেম্বারে অবস্থান করছিলেন।
অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক এইচ এম আনোয়ার প্রধানের পক্ষের আইনজীবীরাও সেখানে ছিলেন। একপর্যায়ে কথা-কাটাকাটি ও উত্তেজনার পর দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতি হয়। এতে নারায়ণগঞ্জ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির আহত হন। একই ঘটনায় সাখাওয়াত হোসেন খানকে হেনস্তা করার অভিযোগও ওঠে।
তবে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের ভাষ্য, মঙ্গলবারের ঘটনাটি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ কিছুদিন ধরেই বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে নেতৃত্বের প্রশ্নে টানাপোড়েন চলছিল। আগে যারা একই রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বলয়ে ছিলেন, তাদের মধ্যেই এখন অবস্থানগত দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
গত আইনজীবী সমিতির নির্বাচনেও সাখাওয়াত ও আনোয়ারকে একই সমীকরণে দেখা গেছে। বিএনপিপন্থী জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে সরকার হুমায়ুন কবিরকে সভাপতি এবং এইচ এম আনোয়ার প্রধানকে সাধারণ সম্পাদক পদে সমর্থন দেওয়া হয়েছিল। পরে নির্বাচনে হুমায়ুন-আনোয়ার প্যানেল বড় জয় পায়।
সেই সময় সাখাওয়াত ও আনোয়ারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সমন্বয় ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে সেই সমীকরণে পরিবর্তন এসেছে। এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে কে আইনজীবী সমিতিতে নেতৃত্ব দেবেন এবং বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের প্যানেল কীভাবে হবে—এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। মঙ্গলবারের সংঘর্ষ এবং বুধবারের পৃথক অবস্থান সেই বিরোধকে আরও প্রকাশ্য করেছে।
ঘটনার পর পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির অভিযোগ করেন, সাখাওয়াত হোসেন খান দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের আইনজীবীদের দুই ভাগে বিভক্ত করার চেষ্টা করছেন। তার দাবি, আইনজীবী ফোরামের সিদ্ধান্তের বাইরে এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। আলোচনা চলার সময় সাখাওয়াতের লোকজন তাদের ওপর হামলা করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানও সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, সাখাওয়াত হোসেন খান ও তার অনুসারীরা তাদের ওপর হামলা করেছেন। আইনজীবী সমিতিকে দুই ভাগে বিভক্ত করার চেষ্টা এবং পিপি নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়েও সাখাওয়াতের সঙ্গে তাদের মতবিরোধ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। সেইসাথে পুরান কোর্ট এলাকায় নির্মিত জুডিশিয়াল ভবনে আইনজীবীরা যেতে চাচ্ছে না তবে এড.সাখাওয়াত আইনজীবীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এ নিয়ে তার সাথে মতপার্থক্য রয়েছে।
অন্যদিকে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা হবে । সেইসাথে আনোয়ার নব্য গডফাদার হতে চায় বলে জানান টিপু। সাখাওয়াতকে আনোয়ার প্রধানের গুরু বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সাখাওয়াত হোসেন খানও ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে দেখছেন। তার বক্তব্য, আইনজীবী সমিতির মতো একটি পেশাজীবী সংগঠনে এ ধরনের ঘটনা কারও জন্যই কাম্য নয়। এছাড়া তিনি বলেন কারও উস্কানিতে আমাকে অসম্মান করার চেষ্টা করা হয়েছে।
আনোয়ার প্রধান জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপির রাজনীতিতে মাঠে সক্রিয় থাকার কারণে দলীয় রাজনীতিতেও তার সাংগঠনিক অবস্থান রয়েছে। অন্যদিকে সাখাওয়াত হোসেন খান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে নগর বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।
ফলে আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধ এখন শুধু বার ভবনের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে থাকছে না। দুই নেতার রাজনৈতিক অবস্থানও এই বিরোধকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে
একসময় একই রাজনৈতিক বলয় ও একই নির্বাচনী সমীকরণের অংশ থাকা সাখাওয়াত-আনোয়ার এখন দুই মেরুতে। নেপথ্যে আইনজীবী সমিতির নির্বাচন হলেও এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে কতটা পড়ে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


































