নারায়ণগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান চলছে জোরেশোরেই। জেলার সাতটি থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে প্রতিদিনই গ্রেপ্তার হচ্ছেন মাদকসেবী ও খুচরা পর্যায়ের কারবারিরা। উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। তবে এসব অভিযানের পরও প্রশ্ন উঠছে—মাদকের বড় কারবারি ও সরবরাহকারীরা কোথায়?
সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই নারায়ণগঞ্জে বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে জেলা পুলিশ। ৯ সেপ্টেম্বর সাত থানায় একযোগে পরিচালিত অভিযানে পাঁচ মাদক ব্যবসায়ী ও ৮৭ মাদকসেবীসহ ৯২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর সাত থানা ও ডিবি পুলিশের বিশেষ অভিযানে ১২ মাদক ব্যবসায়ী ও ৭২ মাদকসেবীসহ মোট ১১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় বিভিন্ন এলাকা থেকে গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইনসহ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।
অভিযানের এই ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে ৩ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসেবে মো. হাবিবুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মাদক, সন্ত্রাস, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান জোরদার করার কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
পুলিশের অভিযান নিয়ে মাঠপর্যায়ের চিত্রও বদলেছে। মাদকের পরিচিত কিছু স্পটে প্রকাশ্য তৎপরতা কমেছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, অভিযান শুরুর পর যারা প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করত, তাদের অনেকে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেছে।
তবে এখানেই সামনে আসছে বড় প্রশ্ন—খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই কি মাদকের সরবরাহব্যবস্থা বন্ধ হবে?
১৪ সেপ্টেম্বর বিকালে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, মাদক নির্মূলে শুধু মাদকসেবীদের গ্রেপ্তার নয়, মাদকের সরবরাহকারী ও আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। তিনি জানান, মাদক নির্মূলে পুলিশ একা পারবে না; গণমাধ্যম, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
এর আগে তিনি মাদকের স্পটগুলোতে অভিযান চালানোর কথা জানিয়ে সাধারণ মানুষকে মাদক ব্যবসায়ীদের তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, মাদক ব্যবসা অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সরবরাহ, অর্থের লেনদেন, পরিবহন ও খুচরা বিক্রির একটি নেটওয়ার্ক। ফলে শুধু স্পটে গিয়ে কয়েকজন বিক্রেতা বা সেবনকারীকে গ্রেপ্তার করলে মাদকের মূল কাঠামো ভাঙা কঠিন।
তাদের মতে, কার কাছ থেকে মাদক আসছে, কারা বড় চালান নিয়ন্ত্রণ করছে, কীভাবে অর্থ লেনদেন হচ্ছে এবং কারা এসব কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা বা আশ্রয় দিচ্ছে—এসব বিষয়েও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মাদকের একাধিক স্পটের অভিযোগ রয়েছে। এসব এলাকায় কারা খুচরা পর্যায়ে মাদক বিক্রি করে, তা স্থানীয়দের অনেকেরই জানা। কিন্তু তাদের পেছনে থাকা সরবরাহকারী বা বড় কারবারিদের শনাক্ত করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে কিছু মাদক কারবারির সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগাযোগ থাকার অভিযোগও রয়েছে। কোনো কোনো কারবারির পক্ষে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তদবিরের অভিযোগও স্থানীয়দের কাছ থেকে শোনা যায়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন এবং নির্দিষ্ট কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ আরোপ করা সমীচীন নয়।
অন্যদিকে পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানে বড় কারবারিদের ধরার কিছু উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। ৭ সেপ্টেম্বর সোনারগাঁওয়ে বিশেষ অভিযানে চার মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ এবং তাদের কাছ থেকে তিন কেজি গাঁজা ও ৫১ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
ফলে চলমান অভিযানের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু ‘কতজন গ্রেপ্তার হলো’—এটি নয়; বরং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে মাদকের বড় সরবরাহকারী, অর্থের জোগানদাতা ও নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্যদের কতটা শনাক্ত করা যাচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, চলমান মাদকবিরোধী অভিযান যেন শুধু মাদকসেবী ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। মাদকের মূল সরবরাহব্যবস্থা, বড় কারবারি এবং তাদের সহযোগীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি প্রভাবশালী কারও আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ থাকলে তা-ও তদন্তের আওতায় আনা হবে।
কারণ, চুনোপুঁটি ধরা পড়লে সাময়িকভাবে স্পট নীরব হতে পারে; কিন্তু মাদকের সরবরাহের মূল উৎস অক্ষত থাকলে সেই বাজার আবারও সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।


































