নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

শনিবার,

০১ আগস্ট ২০২৬

অহংকার নিরাময়ে শিক্ষা

ড. মো: বিল্লাল হোসেন:

প্রকাশিত:১৮:৩৯, ১ আগস্ট ২০২৬

অহংকার নিরাময়ে শিক্ষা

অহংকার হলো নিজের জ্ঞান, গুণ, সম্পদ, ক্ষমতা বা অবস্থান সম্পর্কে এমন এক অতিরঞ্জিত আত্মধারণা, যা মানুষকে অন্যের মর্যাদা ও অবদানকে অস্বীকার করতে শেখায়। আত্মমর্যাদা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে, কিন্তু অহংকার মানুষকে আত্মঅন্ধ করে তোলে। আত্মমর্যাদা বলে, "আমি পারি", আর অহংকার বলে, "শুধু আমিই পারি।"

অহংকার মানবজাতির অন্যতম প্রাচীন নৈতিক দুর্বলতা। ব্যক্তি যখন নিজের জ্ঞান, ক্ষমতা, সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা সাফল্যকে অতিমূল্যায়ন করে এবং অন্যকে নিজের চেয়ে তুচ্ছ ভাবতে শুরু করে, তখনই অহংকারের জন্ম হয়। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সভ্যতার ইতিহাসেও অহংকার বহু সংঘাত, বিভেদ ও পতনের কারণ হয়েছে। তাই প্রকৃত শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল জ্ঞানার্জন নয়, বরং মানুষের অহংকার নিয়ন্ত্রণ করে তাকে বিনয়ী, সহনশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।

অনেকেই মনে করেন, কয়েকটি ডিগ্রি অর্জন বা কিছু তথ্য জানলেই সব জানা হয়ে যায়। অথচ প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে, আর অর্ধজ্ঞান মানুষকে অহংকারী করে তোলে। দার্শনিক সক্রেটিসের বিখ্যাত উক্তি— "আমি শুধু এটুকুই জানি যে আমি কিছুই জানি না।" প্রকৃত জ্ঞানের এই উপলব্ধিই বিনয়ের সূচনা।

ধন-সম্পদ অনেক সময় মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করে। অর্থ তখন মানবিক মূল্যবোধকে ছাপিয়ে যায়। একইভাবে ক্ষমতা মানুষকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দিলেও আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাবে তা অহংকারে রূপ নেয়। ইতিহাসে বহু শাসকের পতনের অন্যতম কারণ ছিল ক্ষমতার অহংকার।

অতিরিক্ত প্রশংসা, চাটুকারিতা ও অযৌক্তিক প্রশ্রয় মানুষকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে। সে নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলে যায়। বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অনুসারীর সংখ্যা, লাইক, মন্তব্য ও জনপ্রিয়তাও অনেকের আত্মপরিচয়ের মাপকাঠিতে পরিণত হয়েছে, যা কৃত্রিম আত্মগৌরব সৃষ্টি করতে পারে।

অনেক সময় মানুষ নিজের উন্নতির পরিবর্তে অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় ভাবতে শেখে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, অনেক অহংকারী মানুষের ভেতরে গভীর অনিরাপত্তাবোধ কাজ করে। নিজের দুর্বলতা আড়াল করতেই তারা অহংকারী আচরণ করে। যেখানে নৈতিকতা, আত্মসমালোচনা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দুর্বল, সেখানে অহংকার সহজেই বিকশিত হয়।

অহংকারের ক্ষতিকর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এটি শেখার আগ্রহ কমিয়ে দেয়, সমালোচনা গ্রহণের ক্ষমতা নষ্ট করে, সম্পর্ক ভেঙে দেয়, নেতৃত্বকে দুর্বল করে এবং কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করে। ব্যক্তি নিজের ভুল বুঝতে পারে না, ফলে আত্মউন্নয়নের পথও সংকুচিত হয়ে যায়।

এখানেই শিক্ষার প্রকৃত ভূমিকা। শিক্ষা মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা চিনতে শেখায়। যত মানুষ জ্ঞান অর্জন করে, ততই উপলব্ধি করে—জানার জগৎ কত বিশাল। এই উপলব্ধিই অহংকারকে কমিয়ে বিনয় সৃষ্টি করে। শিক্ষা সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ ঘটায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং নিজের মতামতকেও যাচাই করার মানসিকতা তৈরি করে। ফলে ব্যক্তি নিজের মতকেই একমাত্র সত্য মনে করে না।

ইতিহাসের অসংখ্য শক্তিশালী ব্যক্তি ও সাম্রাজ্যের পতনের পেছনে অহংকার ছিল অন্যতম কারণ। এসব ইতিহাস মানুষকে সতর্ক করে এবং বিনয় শেখায়। সততা, সহানুভূতি, ক্ষমাশীলতা, কৃতজ্ঞতা ও মানবিকতা অহংকারের কার্যকর প্রতিষেধক। তাই নৈতিক শিক্ষা শুধু একটি বিষয় নয়; এটি চরিত্র গঠনের মূল ভিত্তি।

দলগত কাজ, যৌথ প্রকল্প ও সহশিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের শেখায়—সাফল্য কখনো একার নয়; এটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। বিভিন্ন দেশের সাহিত্য, দর্শন ও মহান ব্যক্তিদের জীবনী পাঠ মানুষকে উপলব্ধি করায় যে পৃথিবী তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। এই উপলব্ধি মানুষকে আরও বিনয়ী করে তোলে। আবার যে শিক্ষা ব্যর্থতাকে অপমান নয়, বরং শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখায়, সেখানে অহংকারের স্থান সংকুচিত হয়।

শিক্ষকের আচরণই শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় পাঠ্যপুস্তক। একজন বিনয়ী, শ্রদ্ধাশীল ও মনোযোগী শিক্ষক অহংকারমুক্ত প্রজন্ম গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

পরিবার ও বিদ্যালয়েরও এ ক্ষেত্রে সমান দায়িত্ব রয়েছে। পরিবারে সন্তানের সাফল্যের পাশাপাশি তার প্রচেষ্টার প্রশংসা করতে হবে, অন্যকে সম্মান করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চর্চা শেখাতে হবে। পাশাপাশি গৃহকর্ম ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। বিদ্যালয়ে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, চরিত্র ও আচরণেরও মূল্যায়ন হওয়া উচিত। সমাজসেবা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম, বিতর্ক, দলীয় কাজ ও নেতৃত্বের মাধ্যমে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা এবং মহান ব্যক্তিদের জীবনী পাঠে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা নয়; বরং এমন মানুষ গড়ে তোলা, যিনি জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি হবেন বিনয়ী, সহানুভূতিশীল ও আত্মসচেতন। কারণ জ্ঞান মানুষকে বড় করে, কিন্তু বিনয় মানুষকে মহান করে। অহংকার মানুষকে সাময়িকভাবে উচ্চ আসনে বসাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তাকে একাকী ও দুর্বল করে তোলে। অন্যদিকে, শিক্ষা যদি শুধু তথ্য প্রদান না করে আত্মজ্ঞান, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটায়, তবে সেটিই হবে অহংকার নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।

শেষ করা যায় একটি গভীর উপলব্ধি দিয়ে—

"যে শিক্ষা মানুষের মাথায় শুধু জ্ঞানের ভার বাড়ায়, কিন্তু হৃদয়ে বিনয় সৃষ্টি করে না—সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ। আর যে শিক্ষা মানুষকে যত বড় করে, তত নম্র করে—সেই শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা।"

লেখক
ড. মো. বিল্লাল হোসেন
উপাধ্যক্ষ
মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ
কাঁচপুর, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ