একটি উন্নত রাষ্ট্রের দৃশ্যমান পরিচয় তার সুউচ্চ ভবন, প্রশস্ত সড়ক, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা মাথাপিছু আয়ের পরিমাণে হলেও নেপথ্যে থাকে একটি অদৃশ্য শক্তি তা হলো মানুষ। আর সেই মানুষকে জ্ঞান, দক্ষতা, যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধে গড়ে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলোর একটি হলো মাধ্যমিক শিক্ষা। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিল্প, বিজ্ঞান কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, কোনো ক্ষেত্রেই দক্ষ মানবসম্পদ হঠাৎ তৈরি হয় না। তার ভিত্তি তৈরি হয় বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। বিশেষত ১২–১৫ বছর বয়সের শিক্ষার্থীরা যখন মাধ্যমিক স্তরে প্রবেশ করে, তখন তারা শুধু তথ্য মুখস্থ করার পর্যায়ে থাকে না বরং যুক্তি প্রয়োগ, সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণ, যোগাযোগ, সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ পেশাজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের পথে এগিয়ে যায়। বিশ্বের সফল শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—তারা মাধ্যমিক শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার ব্যবস্থা হিসেবে দেখেনি, দেখেছে ভবিষ্যৎ নাগরিক ও মানবসম্পদ তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে।
আজকের বিশ্বে একটি দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার মান বোঝার জন্য শুধু কতজন জিপিএ ৫ বা সর্বোচ্চ গ্রেড পেল তা প্রয়োজনীয় হলেও যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হলো— শিক্ষার্থী কি তাকে শেখানো জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারে? নতুন সমস্যা বিশ্লেষণ করতে পারে? বিজ্ঞান ও গণিতের ধারণা বাস্তব পরিস্থিতিতে ব্যবহার করতে পারে?নিজের মতামত যুক্তি দিয়ে প্রকাশ করতে পারে? কতজন প্রযুক্তির সৃজনশীল ব্যবহার করতে পারে? কতজন দলগতভাবে কাজ করতে পারে? কতজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠছে? উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার মূল শক্তি এখানেই—তারা শিক্ষার ফলাফলকে শুধু সনদে নয়, সক্ষমতায় খুঁজে।শিক্ষানীতি পরিবর্তন হলেই শিক্ষা পরিবর্তন হয় না। পরিবর্তন প্রয়োজন শ্রেণিকক্ষে, শিক্ষকের মান উন্নয়নে, প্রশ্নপত্রে, মূল্যায়নে, বিদ্যালয় পরিচালনায়।
পরিকল্পিত মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সিঙ্গাপুরের সাফল্য বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। দেশটির আয়তন ছোট, প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত, কিন্তু তারা বুঝেছিল, মানুষই তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।একটি ভালো শিক্ষাব্যবস্থা কোনো এক বছরের প্রকল্প নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। জাপানের শিক্ষার একটি শক্তি হলো বিদ্যালয়কে শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতিস্থল না বানিয়ে দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা। শিক্ষার্থীর সময়ানুবর্তিতা, দলগত কাজ, বিদ্যালয়ের পরিবেশের প্রতি দায়িত্ব, শিক্ষক ও সহপাঠীর প্রতি সম্মান, এসবকে সেখানে শিক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর ফলে একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি সামাজিক আচরণ ও দায়িত্ববোধও বিকশিত হয়। জাপানের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শৃঙ্খলা আসলে নাগরিকত্ব শিক্ষার অংশ।
দক্ষিণ কোরিয়া শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছে। তাদের অর্থনৈতিক রূপান্তর আধুনিক বিশ্বের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সীমিত সম্পদের দেশ থেকে উচ্চপ্রযুক্তি ও শিল্পনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের পেছনে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।জার্মানির মাধ্যমিক শিক্ষা হলো কর্মজগতের সাথে সেতুবন্ধন। সব শিক্ষার্থীকে একই পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঠেলে না দিয়ে তারা একাধিক শিক্ষাগত ও পেশাগত পথকে মর্যাদা দিয়েছে। জার্মানির বিখ্যাত Dual Vocational Education and Training ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানে বাস্তব প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। অর্থ্যাৎ আধুনিক কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর পথকে সমান গুরুত্ব দেয়া।
উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে মাধ্যমিক শিক্ষার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল দেখা যায়।যেমন– শক্তিশালী মৌলিক দক্ষতা, উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুতি, কর্মসংস্থানযোগ্যতা, প্রযুক্তিগত ও পেশাগত দক্ষতা, সামাজিক সমতা, ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরি। বাংলাদেশকে শুধু সমালোচনার চোখে দেখলে বাস্তবতা অসম্পূর্ণ থাকবে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকার ও লিঙ্গসমতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের নিম্ন-মাধ্যমিক শিক্ষায় gender parity অর্জনের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু বিদ্যালয়ে প্রবেশ আর শেখা এক জিনিস নয়। UNICEF Bangladesh-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে প্রায় ৬৪ শতাংশ শিশু, একই সূত্রে বলা হয়েছে মাধ্যমিক পর্যায়ের স্নাতকদের মাত্র প্রায় ২৫ শতাংশ মৌলিক দক্ষতা অর্জন করে। আমাদের এখন “কতজন স্কুলে যাচ্ছে?” তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো “কতজন সত্যিকার অর্থে শিখছে?”
বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষার অন্যতম বড় সমস্যা হলো পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই যদি শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে যায়, তাহলে শিক্ষা সংকুচিত হয়ে পড়ে।একজন শিক্ষার্থী যদি— সংজ্ঞা মুখস্থ করতে পারে কিন্তু ধারণা ব্যাখ্যা করতে না পারে, সূত্র লিখতে পারে কিন্তু বাস্তব সমস্যায় প্রয়োগ করতে না পারে, ইংরেজি grammar-এর নিয়ম জানে কিন্তু নিজের বক্তব্য প্রকাশ করতে না পারে, বিজ্ঞান বইয়ের অধ্যায় মনে রাখতে পারে কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে প্রশ্ন করতে না পারে, তাহলে তার পরীক্ষার ফল হয়তো ভালো হতে পারে কিন্তু ভবিষ্যতের পৃথিবীর জন্য তার প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এখানে সবচেয়ে বড় ভুল হবে কোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থা হুবহু কপি করা। ফিনল্যান্ডের মডেল বাংলাদেশে হুবহু চলবে না, সিঙ্গাপুরের পদ্ধতিও নয়, জার্মানির dual system-ও একই কাঠামোয় বসানো সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশের জনসংখ্যা, অর্থনীতি, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষকসংখ্যা, সামাজিক বাস্তবতা ও শ্রমবাজার ভিন্ন। আমাদের প্রয়োজন “copy নয়, contextual adaptation”— অর্থাৎ বিশ্ব থেকে ধারণা নিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতায় নতুন মডেল তৈরি করা।
প্রয়োজন মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়া, পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কার করা। উন্নত,আধুনিক এবং ধারাবাহিক শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ শিক্ষক তৈরি করা।প্রয়োজন বিদ্যালয়ভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন জোরদার করা। শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ফেল করার পর তাকে “দুর্বল” ঘোষণা করার পরিবর্তে দুর্বলতা শনাক্ত করে আগেই সহায়তা দেয়া। পরীক্ষা শুধু ফল জানাবে না,পরবর্তী শিক্ষণের পথও দেখাবে। কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষার মর্যাদাগত বিভাজন দূর করা। মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ কর্মজগতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিভিন্ন পথ তৈরি করা।আমাদের সামনে এখন নতুন প্রশ্ন—কীভাবে “স্কুলে যাওয়া” থেকে “শেখা”, “শেখা” থেকে “দক্ষতা”, এবং “দক্ষতা” থেকে “উন্নয়ন”-এর ধারাটি শক্তিশালী করা যায়?
সিঙ্গাপুর দেখিয়েছে—মানুষকে দক্ষ করে সীমিত সম্পদ দিয়েও বিশ্বমানের অর্থনীতি গড়া যায়। জাপান দেখিয়েছে—জ্ঞান ও শৃঙ্খলার সমন্বয়ে মানবসম্পদ তৈরি করা যায়। দক্ষিণ কোরিয়া দেখিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাবিনিয়োগ একটি দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তি হতে পারে। জার্মানি দেখিয়েছে, বিদ্যালয় ও কর্মজগতের সেতুবন্ধন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কার্যকর পথ। কানাডা ও ফিনল্যান্ডের মতো দেশ দেখিয়েছে, উচ্চমানের শিক্ষার সঙ্গে সমতা ও অন্তর্ভুক্তিকেও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। একটি দেশের ভবিষ্যৎ– সংসদে, মন্ত্রণালয়ে, শিল্পকারখানায় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হওয়ার বহু আগেই তৈরি হতে শুরু করে একটি সাধারণ শ্রেণিকক্ষে। তাই উন্নত রাষ্ট্রের নেপথ্যে যে অদৃশ্য শক্তি কাজ করে, তার অন্যতম প্রধান নাম, উন্নত মাধ্যমিক শিক্ষা। বাংলাদেশের আগামী দিনের উন্নয়ন যদি সত্যিই জ্ঞানভিত্তিক, দক্ষতাভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের পথে এগোতে হয়, তবে সেই যাত্রার সবচেয়ে শক্তিশালী সূচনাবিন্দু হতে পারে,একটি উন্নত, সমতাভিত্তিক, দক্ষতামুখী ও বাস্তবজীবনভিত্তিক মাধ্যমিক শিক্ষা।
লেখক-
ড. মো. বিল্লাল হোসেন
উপাধ্যক্ষ
মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ
কাঁচপুর, সোনারগাঁও, নারায়নগঞ্জ


































