নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

শুক্রবার,

০৯ অক্টোবর ২০২৬

ক্রিটিক্যাল থিংকিং: ভবিষ্যৎ শিক্ষার অপরিহার্য দক্ষতা

ড. মো: বিল্লাল হোসেন

প্রকাশিত:১৭:২৩, ৯ অক্টোবর ২০২৬

ক্রিটিক্যাল থিংকিং: ভবিষ্যৎ শিক্ষার অপরিহার্য দক্ষতা

সহজ ভাষায়, কোনো তথ্য, বক্তব্য, সমস্যা বা সিদ্ধান্তকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে যুক্তি, প্রমাণ, বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে নিজের একটি সুসংগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষমতাই ক্রিটিক্যাল থিংকিং। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী শুধু— “উত্তরটি কী?” জানবে না বরং প্রশ্ন করবে— “কেন?” “কীভাবে?” “এর প্রমাণ কী?” “অন্যভাবে কি বিষয়টি দেখা যায়?” “আমি কীভাবে নিশ্চিত হব?” তবে ক্রিটিক্যাল থিংকিং মানে সবকিছুর বিরোধিতা করা নয়। বরং প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রহণ, বর্জন বা সিদ্ধান্ত নেওয়া। মানসম্পন্ন শিক্ষার সঙ্গে রয়েছে এর গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। মানসম্পন্ন শিক্ষা শুধু শিক্ষার্থী কত তথ্য মনে রাখতে পারছে তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না, শিক্ষার্থী সেই জ্ঞান কতটা বুঝতে, প্রয়োগ করতে, বিশ্লেষণ করতে, মূল্যায়ন করতে এবং নতুন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করতে পারছে—তার ওপরও নির্ভর করে।

একজন শিক্ষার্থী যদি গণিতের একটি সূত্র মুখস্থ করে পরীক্ষায় ৫ নম্বর পায়, সেটি জ্ঞান অর্জনের একটি স্তর। কিন্তু সে যদি জানতে পারে— সূত্রটি কেন কাজ করে? অন্য পদ্ধতিতে সমস্যাটি সমাধান করা যায় কি? উত্তরটি যৌক্তিক কি না? বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ কোথায়? তাহলে সেখানে ক্রিটিক্যাল থিংকিং তৈরি হচ্ছে। ক্রিটিক্যাল থিংকিং মুখস্থনির্ভরতা কমায়, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ায়, যুক্তিবোধ ও বিচারক্ষমতা উন্নত করে, সৃজনশীল চিন্তাকে উৎসাহিত করে, ভুল তথ্য ও গুজব যাচাই করার ক্ষমতা তৈরি করে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বাড়ায়, প্রশ্ন করার সংস্কৃতি তৈরি করে, বাস্তব জীবনের সমস্যায় জ্ঞান প্রয়োগ করতে সাহায্য করে।

শিক্ষার উদ্দেশ্য কি শুধু কিছু তথ্য মনে রাখা? পরীক্ষার খাতায় সঠিক উত্তর লেখা? ভালো নম্বর পাওয়া? সার্টিফিকেট অর্জন করা? নিশ্চয়ই এগুলো শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ কিন্তু শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য এর চেয়ে অনেক বড়। শিক্ষা মানুষকে এমনভাবে গড়ে তুলবে, যাতে সে প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারে, তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারে, সমস্যার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করতে পারে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর এই সক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছে ক্রিটিক্যাল থিংকিং।বর্তমান বিশ্বে তথ্যের অভাব নেই। ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সার্চ ইঞ্জিন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সামনে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য তথ্য হাজির করছে। কিন্তু কোনটি সত্য, কোনটি ভুল, কোনটি অর্ধসত্য, কোনটি বিভ্রান্তিকর—তা নির্ণয় করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একজন ক্রিটিক্যাল থিংকার অন্ধভাবে কোনো কথা বিশ্বাস করেন না। তিনি প্রশ্ন করেন,তথ্যের উৎস জানতে চান, ব্যাখ্যা জানতে চান।

 

বাস্তব জীবন পরীক্ষার খাতার মতো নয়। জীবনের প্রশ্ন সবসময় বইয়ের শেষে দেওয়া থাকে না। অনেক সময় প্রশ্নটি নিজেকেই তৈরি করতে হয়। উত্তরও বইয়ের নির্দিষ্ট একটি পাতায় পাওয়া যায় না। একজন প্রকৌশলী যখন একটি সমস্যার সমাধান করেন, একজন চিকিৎসক যখন রোগীর বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করেন, একজন শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীর দুর্বলতা শনাক্ত করেন, একজন উদ্যোক্তা যখন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেন কিংবা একজন নাগরিক যখন রাজনৈতিক বক্তব্য বিচার করেন—সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় চিন্তা, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। তাই ভবিষ্যৎ শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত— “শিক্ষার্থীকে কী ভাবতে হবে”, “কীভাবে ভাবতে হবে” তা শেখানো।একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যদি বলেন, তোমার উত্তরটি কেন সঠিক?“বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ কী?” তাহলে শিক্ষার্থীর চিন্তার জগৎ প্রসারিত হয়।যে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সেখানে গভীর চিন্তার বিকাশ কঠিন। ভুল উত্তর দেওয়ার ভয়, শিক্ষকের বিরক্ত হওয়ার ভয় কিংবা সহপাঠীদের হাসির ভয়—এসব শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক কৌতূহলকে সংকুচিত করে।

বর্তমান পৃথিবীতে একজন শিক্ষার্থী দিনে অসংখ্য তথ্যের মুখোমুখি হয়। AI খুব দ্রুত উত্তর দিতে পারে, কিন্তু প্রতিটি উত্তর যে সঠিক হবে—তার নিশ্চয়তা নেই। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীকে শুধু AI ব্যবহার শেখালে হবে না তাকে AI-এর উত্তর যাচাই করতেও শেখাতে হবে। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় রাস্তা, সেতু, ভবন বা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন চিন্তাশীল, দায়িত্বশীল ও যুক্তিবাদী নাগরিক। যে নাগরিক কোনো গুজব যাচাই না করে বিশ্বাস করেন না, রাজনৈতিক বক্তব্যের তথ্য পরীক্ষা করেন, সরকারি নীতি নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন করেন, পরিবেশগত সমস্যা নিয়ে তথ্য বিশ্লেষণ করেন এবং সামাজিক সমস্যার কারণ অনুসন্ধান করেন—তিনি শুধু শিক্ষিত নন, তিনি সচেতন নাগরিক। অতএব ক্রিটিক্যাল থিংকিং– ব্যক্তি উন্নয়ন থেকে জাতীয় উন্নয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত। চিন্তার মান উন্নত হলে সিদ্ধান্তের মান উন্নত হয়,সিদ্ধান্তের মান উন্নত হলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের কর্মদক্ষতাও উন্নত হয়।একজন কর্মী যত ভালোভাবে সমস্যা বিশ্লেষণ করতে পারবেন, ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারবেন এবং যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তাঁর মূল্য তত বাড়বে।

শিক্ষকই হতে পারেন এই পরিবর্তনের প্রধান কারিগর।ক্রিটিক্যাল থিংকিং শেখানোর জন্য আলাদা কোন বিষয়ের প্রয়োজন নেই।প্রতিটি বিষয়ের শিক্ষাদান পদ্ধতির মধ্যেই এটি যুক্ত করতে হবে। পরীক্ষাব্যবস্থাতেও আনতে হবে পরিবর্তন।যদি শিক্ষাব্যবস্থা শুধু মুখস্থ উত্তরকে মূল্যায়ন করে, তাহলে শিক্ষার্থীও মুখস্থ করতে উৎসাহিত হবে। তাই ভবিষ্যৎ মূল্যায়নে এমন প্রশ্ন বাড়াতে হবে যেখানে শিক্ষার্থীকে—বিশ্লেষণ করতে হবে, কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে,তুলনা করতে হবে, প্রমাণ দিতে হবে, যুক্তি উপস্থাপন করতে হবে, বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে হবে, নিজের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে হবে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎ বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিতে হলে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করার স্বাধীন পরিবেশ তৈরি করতে হবে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পাশাপাশি অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ ও সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষা বাড়াতে হবে।শিক্ষক প্রশিক্ষণে ক্রিটিক্যাল থিংকিং এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।পরীক্ষার প্রশ্নে শুধু “কি?” নয়—“কেন?”, “কীভাবে?”এ ধরনের প্রশ্ন বাড়াতে হবে।শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের সমস্যা নিয়ে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষা এমন মানুষ তৈরি করতে হবে যে শুধু প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে না বরং প্রশ্নের গভীরে যেতে পারে। যে শিক্ষার্থী শুধু তথ্য গ্রহণ করে সে তথ্যবান হতে পারে কিন্তু যে তথ্যকে যাচাই করে, বিশ্লেষণ করে, যুক্তির সঙ্গে ব্যবহার করে এবং প্রয়োজন হলে নিজের ধারণা পরিবর্তন করতে পারে—সে হয়ে ওঠে চিন্তাশীল মানুষ।ভবিষ্যতের পৃথিবীতে প্রযুক্তি দ্রুত বদলাবে, পেশা বদলাবে, কর্মক্ষেত্র বদলাবে, তথ্যের ধরন বদলাবে। কিন্তু মানুষের একটি দক্ষতা সব পরিবর্তনের মধ্যেও মূল্যবান থাকবে, সেটি হল সঠিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা। তাই আজকের শিক্ষা যদি আগামী দিনের নাগরিক তৈরি করতে চায়, তাহলে বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে চিন্তার দরজা খুলতে হবে, মুখস্থ উত্তরের গণ্ডি পেরিয়ে যুক্তি, অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের জগতে প্রবেশ করতে হবে।কারণ—শিক্ষার সার্থকতা শুধু শিক্ষার্থী কত কিছু জানে, তার মধ্যে নয় বরং কত গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে—তার মধ্যে নিহিত।আর সেই গভীর চিন্তার অন্যতম শক্তিশালী চাবিকাঠি হলো— ক্রিটিক্যাল থিংকিং । ভবিষ্যৎ পৃথিবীর প্রতিযোগিতা শুধু জ্ঞানের প্রতিযোগিতা হবে না, হবে চিন্তার প্রতিযোগিতা। আর যে জাতি তার সন্তানদের ভালোভাবে চিন্তা করতে শেখাবে, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনাও সেই জাতিরই বেশি।

 

লেখক -

 

ড. মো. বিল্লাল হোসেন

উপাধ্যক্ষ

মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ 

কাঁচপুর, সোনারগাঁও, নারায়নগঞ্জ

সম্পর্কিত বিষয়: