নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

শনিবার,

২৬ নভেম্বর ২০২২

সন্ত্রাসী ভুমিদস্যু চাঁদাবাজদের টার্গেট সিদ্ধিরগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগের শীর্ষ পদ

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:২০:০০, ৫ অক্টোবর ২০২২

সন্ত্রাসী ভুমিদস্যু চাঁদাবাজদের টার্গেট সিদ্ধিরগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগের শীর্ষ পদ

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সম্মেলন ঘিরে কর্মী সমর্থকদের মধ্যে উৎসবমুখোর পরিবেশ বিরাজ করছে। ইতমধ্যে সম্মেলন সফল করতে প্রস্তুতিমূলক সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কারা আসছেন নতুন নেতৃত্বে তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।

 

আবার সমালোচনাও আছে যারা আসার চেষ্টা করছেন তাদের অনেককে নিয়ে। কারণ তাদের বিরুদ্ধে ভুমিদস্যুতা, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগ ওপেন সিক্রেট। সাধারণ নেতাকর্মীরা বলছেন, বিতর্কিত , চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসীরা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিতে মোটা অংকের টাকা খরচ করেছেন এবং করছেন।

 

এদিকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বিতর্কিত, ভুমিদুস্য, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাইয়ে দিতে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের দুই শীর্ষ নেতা ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবকলীগের বিলুপ্ত কমিটির শীর্ষ এক নেতার মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ফলে পাল্টা পাল্টি প্রস্তুতি সভাও হচ্ছে। দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে দুটি গ্রæপ কমিটির শীর্ষ দুটি পদ বাগিয়ে নিতে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।  

 

সূত্রমতে, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সম্মেলন সফল করতে সবশেষ গত ১৭ সেপ্টেম্বর বিকালে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় মিজমিজি টিসি রোডস্থ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব মো. মজিবুর রহমানের বাসভবনে।

 

ওই সভায় বক্তারা বলেন, বর্তমানে দলে অনেক হাইব্রিড নেতার আবির্ভাব ঘটেছে। তাই কমিটি গঠনের পূর্বে নেতাকর্মীদের সিএস, আরএস দেখে কমিটি গঠন করতে হবে। সিদ্ধিরগঞ্জে মোট দশটি ওয়ার্ড রয়েছে। প্রত্যেকটি ওয়ার্ড থেকে ত্যাগীদের সমন্বয়ে কমিটি করতে হবে।

 

যাদের পরিবার আওয়ামীলীগ করে তাদেরকে নিয়েই কমিটি গঠন করার পরামর্শ দেন নেতৃবৃন্দ। তারা আরো বলেন, কোনভাবেই যেন জামাত-বিএনপির কেউ দলে বা কমিটিতে প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মজার বিষয় হলো, ভুমিদস্যু, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, একাধিক মামলার আসামী কমিটিতে আসতে পারবে কিনা তা নিয়ে কোন বক্তব্য নেই।

 

যেমন ভুমিদস্যু ও শিমরাইল রেন্ট এ কার স্ট্যান্ডের দীর্ঘদিনের চাঁদাবাজ সিদ্ধিরগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক ভূইয়া রাজুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় ওই আলোচনা সভা। আর সভা পরিচালনা করেন, চাঁদাবাজিসহ ৭টি মামলার আসামী বিতর্কিত জহিরুল হক।

 

অথচ এমন একটি সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি কাজী শাহানারা ইয়াসমিন।

 

বিশেষ অতিথি ছিলেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য চৈতালী চক্রবর্তী, মিরাজ বিল্লাহ, প্রধান বক্তা ছিলেন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব মোঃ মজিবুর রহমান, বিশেষ বক্তা ছিলেন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব ইয়াছিন মিয়া।

 

স্থানীয়দের তথ্যমতে, আমিনুল হক রাজুর বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জে মিশরাইল মোড়ে রেন্ট কার স্ট্যান্ড থেকে চাঁদাবাজি ও ২নং ওয়ার্ডের মিজমিজি এলাকায় ভুমিদস্যুতার অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। এরমধ্যে সম্প্রতি রেন্ট কার স্ট্যান্ড থেকে সে বিতারিত হয়েছে। কিন্তু তার ভুমিদস্যুতা থেমে নেই।

 

এছাড়া তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, টাকার বিনিময়ে সে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ি, সন্ত্রাসী ও হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামী টাইগার ফারুককে থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগের কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে অন্তভুক্ত করতে দেনদরবার চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

মোটকথা সিদ্ধিরগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবকলীগের বারোটা বাজাতে রাজু যা-ইচ্ছা তাই করে যাচ্ছেন। বিগত দিনে তার অদক্ষতা, স্বেচ্ছাচারিতার কারণে থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাংগঠনিক অবস্থা শূণ্যের কোঠায় নেমে আসে।

 

অপরদিকে শিমরাইল মোড়ের আরেক চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী সিব্বির আহম্মেদ। তার বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে। সেও থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগের শীর্ষ পদ বাগিয়ে নিতে মাঠে নেমেছে। গত বছরের ১২ ফেব্রæয়ারী দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি শিব্বির আহমেদকে সাংগঠনিক শৃংখলা ভঙ্গের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মহানগর স্বেচ্ছোসেবক লীগের সভাপতি জুয়েল আহমেদ ও সাধারন সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধানের যৌথ সিদ্ধান্ত ক্রমে বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখার সকল প্রকার সাংগঠনিক কর্মকান্ড থেকে অব্যহতি প্রদান পূর্বক সংগঠন থেকে সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করা হয়।

 

এদিকে স্থানীয় আওয়ামী কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মীরা জানান, শিব্বির আহমেদ ও তার ভাই জসিম চার দলীয় জোট সরকারের আমলে বিএনপি দলীয় সাবেক সাংসদ গিয়াস উদ্দিনের ক্যাডার ছিলো।

 

বিএনপির আমলে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে শিমরাইল মোড়ে সরকারী জমি দখল করে মার্কেটও নির্মাণ করেছেন এ দুই সহোদর। তাদের দখলধারীত্ব টিকিয়ে রাখেতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মিটিং মিছিলে অংশ নিয়ে তারা চলে আসে আওয়ামী লীগের ছায়া তলে। এবং বিএনপির কিছু ক্যাডার নিয়ে গড়ে তোলে সন্ত্রাসী বাহিনী।


জহিরুল হক শিমরাইল মোড়ে চাঁদাবাজির সময় হাতে নাতে র‌্যাব-১১ এর হাতে গ্রেপ্তার হয়। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে ৭টি মামলা রয়েছে। বর্তমানে শীতলক্ষ্যা পাড়ের ওয়ার্কওয়ে ও সরকারী জায়গা দখল করে পাথর-বালুর ব্যবসা করছে। জহিরুল হকের দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, মদকসহ বিভিন্ন অপরাধে বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে।

 

জহিরুল হকের দুই ভাইও র‌্যাব-পুলিশের হাতের গ্রেপ্তার হয়েছে। এমন অবস্থায় জহিরুল হক যদি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগের শীর্ষ পদে আসীন হয় তাহলে এটা হবে চরম লজ্জার। দলের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হবে সাধারণ মানুষের মধ্যে। তারা বলবে, স্বেচ্ছাসেবকলীগের নেতৃত্বে এরা কারা? এমন কথা বলছেন স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা। 


সিদ্ধিরগঞ্জ থানার তথ্যমতে, জহিরুল ইসলাম ওরফে তুহিন, শিমরাইল উত্তরপাড়া এলাকার মৃত: ধনু মেম্বারের ছেলে। যদিও জহিরুল হক প্রচার করে সে জাতীয় শ্রমিকলীগের সাবেক সভাপতি আবদুল মতিন মাস্টার তার চাচা। কিন্তু যোগযোগ করা হলে আবদুল মতিন মাস্টার জানান জহিরুল হক নামে তার কোন ভাতিজা নাই। 

 

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, জহিরুল হক ও সিব্বিরকে শীর্ষ পদের লোভ দেখিয়ে বিলুপ্ত মহানগর স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাবেক সভাপতি জুয়েল হোসেন মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। পৃথক পৃথকভাবে দুইজনের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কমিটিতে অন্তভক্ত করতে জুয়েল দেনদরবার চালাচ্ছেন।

 

বর্তমানে জুয়েল সিব্বিরের পক্ষ নিয়েছেন। ফলে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছেন জহিরুল হক। কারণ বিগত দিনে জহিরুল হক জুয়েলকে আর্থিক সুবিধা দিয়েছেন। ওদিকে থানা আওয়ামীলীগের দুই শীর্ষ নেতাও জহিরুল হক ও আমিনুল হক রাজুর পক্ষে কাজ করছেন।


সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জানান, নারায়ণগঞ্জ মহানগর কমিটি বিলুপ্তি হয়ে যাওয়ায় নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সাবেক সভাপতি জুয়েল হোসেন বিতর্কিতদের নিয়ে সভা করেছে। জুয়েলের প্রতি ত্যাগী নেতাকর্মীদের আস্থা না থাকায় তিনি নব্য আওয়ামীলীগদের দলে স্থান করে দিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করার জন্য মাঠে নেমেছে।

 

দলীয় সূত্রমতে, রাজু ও জহির সম্মেলন সফল করতে প্রস্তুতি সভা করছেন, আবার সিব্বিরও আলাদাভাবে প্রস্তুতি সভা করছেন। ১ অক্টোবর) ১নং ওয়ার্ডের হীরাঝিল জোড়া ভবন এলাকায় সদস্য সংগ্রহ ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা ও মহানগর আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের উদ্যোগে ওই সভা অনুষ্ঠিত হলেও নেতৃত্ব দিয়েছেন বহুল বিতর্কিত সিব্বির আহম্মেদ।

 

অনুষ্ঠান বিষয়ে কিছুই জানেন না থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের শীর্ষ নেতারা। মোটকথা থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগের শীর্ষ দুই পদ বাগিয়ে নিতে বিতর্কিত, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ভুমিদস্যুদের মধ্যে প্রতিযোগতা শুরু হয়েছে।  এক পর্যায়ে জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে বুধবার (৫ অক্টোবর) বিকালে থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি মজিবুর রহমানের বাসভবনের নিচতলায় সম্মলন প্রস্তুতি সভা শুরু হয়।

 

কিন্তু কেন্দ্রীয় নেত্রী ও থানা আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে দুই গ্রæপ হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সভাস্থল ত্যাগ করেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি কাজী শাহানারা ইয়াসমিন। তাকে নিরাপদে সরিয়ে দেন দলের নেতাকর্মীদের একটি অংশ।

 

ওদিকে অভিযোগ সম্পর্কে মহানগর স্বেচ্ছানেবকলীগের সাবেক সভাপতি জুয়েল হোসেন বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জ স্বেচ্ছাসেবকলীগের আগে ওয়ার্ড কমিটি আসবে তারপর থানা কমিটি আসবে। এরকমই বলছেন নেতৃবৃন্দরা। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের কমিটিতে অর্šÍভুক্ত করার প্রসঙ্গে বলেন, আসলে মানুষ কত কথাই বলে।

 

মৌখিক কথা একটা, ডকুমেন্টস আরেক বিষয়। আমাদের সভায় স্বেচ্ছাসেবকলীগের অনেক সিনিয়র নেতারা এসেছিলেন। এখানে আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দ যারা দলের জন্য কাজ করেছেন, তারা যাচাইবাছাই করে দিবে। আমার মতে, সংগঠন করতে টাকা না, মেধা লাগে।

 

আমি যখন মহানগর স্বেচ্ছানেবকলীগের সভাপতি ছিলাম, মানুষকে নিয়ে আমি কাজ করেছি। দেনদরবারের বিষয়ে কে কি বলেছেন, আমি তো কিছু শুনি নাই।