নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

সোমবার,

৩০ জানুয়ারি ২০২৩

১৩৭ বছরেও নির্মাণ হয়নি ঢাকা-নারায়গঞ্জ রেলপথ ডাবল লাইন 

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:১৭:১৯, ১৫ জানুয়ারি ২০২৩

১৩৭ বছরেও নির্মাণ হয়নি ঢাকা-নারায়গঞ্জ রেলপথ ডাবল লাইন 

‘নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা’ ১৪ কিলোমিটার রেলপথ তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। নারায়ণগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের জন্য ১৮৮৫ সালে এই রেলপথ নির্মাণ করে তৎকালীন ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে। তখনই রেলপথটির গুরুত্ব বিবেচনা করে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৩৭ বছর পরেও নারায়গঞ্জ-ঢাকা রেলপথ ডাবল লাইন নির্মাণ হয়নি। 


ওই পরিকল্পনার ১২৯ বছর পর ২০১৪ সালে ডাবল লাইনের প্রকল্প নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরাল একটি ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ’ এই প্রকল্পটি তিন বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা ৮ বছর যাবৎ চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। 


তবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) ১২ শতাংশ জমি দিতে সম্মত হওয়ায় ঢাকা-নারায়গঞ্জ ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণের জটিলতা কেটে গেছে। তাই পুরনো রেলপথটি সংস্কারের জন্য প্রকল্পের ডিপিপি আরেক দফা সংশোধন করা হচ্ছে। এতে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় আরেক দফা বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।


শনিবার (১৪ জানুয়ারি) নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীসহ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ। এ সময় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণের ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানে ১২ শতাংশ জমি দিতে সম্মত হয় নাসিক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। তবে চাষাঢ়া এলাকায় সড়কপথের যানজট নিয়ন্ত্রণে লেভেল ক্রসিং আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয় নাসিকের পক্ষ থেকে। এক্ষেত্রে সমন্বয় করে কাজ করা হবে বলে রেলওয়ে পক্ষ থেকে জানানো হয়।


এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণের জন্য চাষাঢ়া এলাকায় সামান্য জায়গা দরকার ছিল। ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানে নাসিক মেয়রসহ এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। এর ফলে সামান্য কিছু ভূমি দিতে নাসিক মেয়র সম্মত হয়েছেন। তাই ঢাকা-নারায়গঞ্জ ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণে আর জটিলতা থাকল না। পুরো অংশটি ডাবল লাইন করা হবে। এতদিন এই সামান্য অংশটুকুর জন্য কাজ বন্ধ ছিল। এ ছাড়া পুরনো লাইন উঁচু করে সংস্কার করা হয়েছে। তাই প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধনের প্রয়োজন হবে বলে জানান তিনি।  


রেলওয়ে সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার রেললাইনকে ডুয়েল গেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণে প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৪ সালে। ২০১৭ সালে জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল। এর মধ্যে পদ্মাসেতুর কাজের জন্য রেলপথটি ১৪ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ১২ কিলোমিটার করা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ চার দফা বৃদ্ধি ও ব্যয় এক দফা বৃদ্ধি করা হয়। আট বছর যাবৎ চলছে প্রকল্পের কাজ। সর্বশেষ চলতি বছরে ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।


২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরাল একটি ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ’ প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি)। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৭৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাপানের অনুদানের অর্থ রয়েছে ২৪৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। বাকি ১২৯ কোটি ১১ লাখ টাকা সরকারের তহবিল থেকে ব্যয় করা করার কথা।


পরবর্তীতে প্রকল্পের ব্যয় ২৫৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৩২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৬৭ দশমিক ১১ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়। তবে প্রকল্পটির বাড়তি টাকা দিতে রাজি হয়নি জাপান সরকার। ফলে ৩৮৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। 
ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে প্রকল্পের সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (আরডিপিপি)’তে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান মিটার গেজ রেললাইনের সমান্তরালে একটি ডুয়েল গেজ লাইন নির্মাণ কাজ চলছে। নতুন ডুয়েল গেজ লাইনটি বিদ্যমান রেললাইনের চেয়ে অনেক উঁচু। এতে বিদ্যমান রেললাইন অসমতল হয়ে পড়বে। এতে স্টেশন, সেতু, প্ল্যাটফর্ম ও লেভেল ক্রসিংয়ে জটিলতা বাড়বে। ফলে ট্রেন চলাচলে জটিলতা সৃষ্টি হবে। আবার লেভেল ক্রসিংগুলোয় সাধারণ যানবাহন চলাচলেও সমস্যা সৃষ্টি হবে।


এ সমস্যা পরিহারে নতুন একটি প্যাকেজের মাধ্যমে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনটিও ডুয়েল গেজে রূপান্তর করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় কমলাপুর থেকে জুরাইন পর্যন্ত বিদ্যমান লাইন ডুয়েল গেজ করা হচ্ছে। বাকি অংশের মধ্যে জুরাইন থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন করা হচ্ছে। 


এ ছাড়া প্রকল্প এলাকায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় তিনটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) জন্য একটি দোতলা ভবন কাম ব্যারাক নির্মাণ, সরকারি রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) জন্য একটি দোতলা ভবন কাম ব্যারাক নির্মাণ এবং গেন্ডারিয়া থেকে চাষাঢ়ার মাঝে পাঁচটি গ্যাং হাট নির্মাণ নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান রেললাইনটি সংস্কারে কোনো রক্ষণাবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কিন্তু বাস্তব কাজ করতে গিয়ে কিছু অংশ রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়েছে। তাই সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় কিছুটা বাড়ানো হয়েছে বলে প্রকল্পের সংশ্লিষ্টরা জানান।


এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. সেলিম রউফ বলেন, ‘চাষাঢ়া থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত এই রেলপথের ডাবল লাইন করতে হলে ১২ শতাংশ জমির প্রয়োজন। জমিটি দিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন সম্মত হয়েছে। তাই ডাবল লাইন নির্মাণে আর কোনো সমস্যা হবে না। তবে বিদ্যমান মিটার গেজ লাইনকেই ডুয়েল গেজ করে প্রকল্প শেষ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
 

সম্পর্কিত বিষয়: