নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

রোববার,

২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইউপি নির্বাচন ঘিরে চাঙ্গা নারায়ণগঞ্জের তৃণমূলের রাজনীতি

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:১৯:০৯, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইউপি নির্বাচন ঘিরে চাঙ্গা নারায়ণগঞ্জের তৃণমূলের রাজনীতি

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের তৃণমূলের রাজনীতিতে নতুন করে তৎপরতা বেড়েছে। আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হতে পারে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সে হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে আগামী নভেম্বরে সারাদেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। এমন আলোচনা ছড়িয়ে পড়ার পর জেলার পাঁচ উপজেলার ৩৯টি ইউনিয়নে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে। গ্রাম, হাট-বাজার, পাড়া-মহল্লা ও চায়ের আড্ডায় এখন আলোচনার কেন্দ্রে সম্ভাব্য প্রার্থী ও নির্বাচনী সমীকরণ।

এবারের নির্বাচন আগের তুলনায় ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হতে যাচ্ছে। দলীয় প্রতীক না থাকায় প্রার্থীরা নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করবেন। ফলে দলীয় মনোনয়নের বাইরে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মী, সামাজিকভাবে পরিচিত ব্যক্তি ও উঠতি রাজনীতিকদের স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সামাজিক যোগাযোগ ও নিজস্ব কর্মী-সমর্থক বলয়ের গুরুত্ব বাড়ছে।

সারাদেশের মতো নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির স্থানীয় সাংগঠনিক প্রভাবও আগের অবস্থায় নেই। ফলে ইউনিয়ন নির্বাচন ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। মাঠে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সমর্থিত সম্ভাব্য প্রার্থীদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের তৎপরতাও বাড়ছে।

তবে এই তিন রাজনৈতিক দলের বাইরেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক রয়েছেন, যারা কখনো দলটির কোনো পদ-পদবিতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত এসব ব্যক্তির কেউ কেউ এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। দলীয় পদে না থাকায় তাদের নির্বাচনী অংশগ্রহণের বিষয়টি নির্ভর করবে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা ও বিদ্যমান নির্বাচনী বাস্তবতার ওপর।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউনিয়নগুলোর প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তনের বিষয়টি। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগর ইউনিয়নকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সীমানায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে জেলা প্রশাসন। ফলে এই তিন ইউনিয়নে নির্বাচনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা কী হবে, তা নিয়েও স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।

অন্যদিকে নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আর্থিক প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রচার, কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ, সামাজিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রার্থীদের মধ্যে কে কতটা আর্থিকভাবে সক্ষম, কার নিজস্ব কর্মী-সমর্থক রয়েছে এবং কে নির্বাচনী মাঠে দীর্ঘ সময় ধরে খরচ চালাতে পারবেন এসব হিসাবও স্থানীয় রাজনীতির আলোচনায় আসছে। বিশেষ করে কর্মী-সমর্থক ধরে রাখা, বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে উপস্থিতি, প্রচার-প্রচারণা এবং ভোটারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বড় অঙ্কের অর্থ প্রস্তুত রাখতে হচ্ছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। 

সেইসাথে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বড় একটি অংশ স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। দলীয় প্রতীক না থাকলেও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সমন্বয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন অনেকে। ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে এমপিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপস্থিত হওয়া এবং নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপি এবং একটিতে এনসিপির প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার পর স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। ইউনিয়ন নির্বাচন সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট এলাকার সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে তৎপর। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে অনুসারী ও কর্মী সমন্বয়ের কাজও চলছে। সেইসাথে নিজস্ব লোকও খুঁজছে সংসদ সদস্যরা।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা শুধু রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে গিয়ে কর্মী-সমর্থক গোছানো, ঘরোয়া বৈঠক, উঠান বৈঠক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর কাজ চলছে। কেউ সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন, আবার কেউ ব্যানার-ফেস্টুনের মাধ্যমে এলাকায় পরিচিতি বাড়াচ্ছেন।

এতে দলীয় প্রতীক না থাকায় প্রত্যেক প্রার্থীকে নিজস্ব জনবল ও সামাজিক যোগাযোগের ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে। ফলে এখন থেকেই পরিবারভিত্তিক যোগাযোগ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং স্থানীয় পর্যায়ে অনুসারী তৈরির চেষ্টা চলছে।

তৃণমূলের রাজনীতিতে এবার ব্যক্তিগত বলয়ের গুরুত্বও বাড়ছে। দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, এলাকায় দীর্ঘদিনের সামাজিক অবস্থান, কর্মী-সমর্থকের সংখ্যা এবং নির্বাচনী ব্যয় বহনের সক্ষমতা সবকিছু মিলিয়েই সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান পরিমাপ করছেন।

তফসিল ঘোষণার পর এই তৎপরতা আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে যারা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন, তারা নিজেদের শক্তি যাচাইয়ের পাশাপাশি কার সঙ্গে সমঝোতা করা যায়, কার সমর্থন পাওয়া সম্ভব এবং শেষ পর্যন্ত কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন এসব হিসাব করছেন।

সব মিলিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বিষয়গুলোকে ঘিরেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এই তৎপরতা আরও স্পষ্ট রূপ নেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।