গেল ১২ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বচনে সিদ্ধিরগঞ্জে দাড়িপাল্লার কাছে অকল্পনীয়ভাবে ধরাসায়ী হয়েছে বিএনপি। দৃশ্যমানভাবে অতীতের যেকোন নির্বাচনের থেকে এই নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর এই এলাকায় প্রতিদ্বন্দিতা হয়ে আসছিলো নৌকা ও ধানের শীষের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। বরাবরই আওয়ামীলীগ বিজয়ী হয়েছে। কিন্তু আওয়ামীলীগ বিহীন নির্বাচনে বিএনপির পরাজয়ের গ্লানি মুছবার এক বিরল সুযোগও হাত ছাড়া করেছে বিএনপি। কিন্তু বিএনপি’র কেন এই পরাজয় ? এই পরাজয় নিয়ে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী পেশার ভোটার ও রাজনীতি সচেতন মানুষের সাথে কথা বলে এবং অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নেপথ্যের নানা কারণ। এই কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ৫ আগষ্ট পরবর্তী কতিপয় বিএনপি নেতার বিতর্কিত কর্মকান্ড, প্রার্থীর যোগ্যতা এবং নির্বাচন পরিচালনায় বিতর্কিতদের দায়িত্ব দেওয়া।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকাটি এবার সোনারগাঁ উপজেলার সাথে যুক্ত হয়ে সংসদীয় আসন নারায়ণগঞ্জ-৩ করা হয়। আসনটিতে মোট পোষ্টাল কেন্দ্র ব্যাতিত ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৭৭৩ জন ভোটারের মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জে ভোটার ২ লাখ ২৩ হাজার ৮১২ জন। ধানের শীষের প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী দাড়িপাল্লা প্রতীকের মো: ইকবাল হোসাইন ভুইয়ার চেয়ে ২০ হাজার ৪৮২ ভোট বেশী পেয়ে বিজয়ী হলেও সিদ্ধিরগঞ্জে দাড়িপাল্লা প্রতীক ধানের শীষের চেয়ে ৬ হাজার ১০ ভোট বেশী পেয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জে ৬৭টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৪০টিতে বিজয়ী হয়েছে দাঁড়িপাল্লা। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন পেয়েছেন ৭ হাজার ৬৩২ ভোট। এই আসনে মোট ১১ জন প্রার্থীর মধ্যে ৯ জনের জামানত বাজেয়াপÍ হয়েছে।
৫ আগষ্ট পরবর্তী বিএনপির কর্মকান্ড:
স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘ সাড়ে পনের বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই-আগষ্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে। একদিকে শেখ হাসিনা ও তাঁর অনুসারীরা ৫ আগষ্ট দুপুরের আগেই দেশ-বিদেশে পালিয়ে যায় একযোগে। বেলা গড়িয়ে বিকেল থেকেই শুরু হয় বিএনপি’র কিছু বিপদগামী নেতাকর্মীর আওয়ামীলীগসহ বিভিন্ন মানুষের বাড়ী-ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙ্গচুর, লুটপাট ও অগ্নিসেংযোগ। বিভিন্ন মানুষকে জিম্মি করে টাকা আদায়, সম্পত্তি, মার্কেট ও হাট-ঘাট দখল। নিরীহ মানুষদের মামলার ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় এবং অগনিত নিরীহ মানুষকে মিথ্যা মামলায় আসামী করা। কেউ কেউ জড়িয়ে পড়েন মাদক ব্যবসায়। তাঁরা হয়ে উঠেন অপরাধীদের আশ্রয়স্থল। একপর্যায়ে গুরুতর নানা অভিযোগের তদন্ত শেষে মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের নেতৃত্বের জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করেন ওই সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান)। বহিষ্কার করা হয় দলের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেনকে। পুলিশ গ্রেফতার করে ডিটেনশন ও মামলা দেয় মহানগর শ্রমিক দলের সভাপতি এসএম আসলাম ও তরুণদল নেতা টিএইচ তোফাকে। তারপর তাদেরকেও বহিষ্কার করা হয় দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পদ থেকে। এর আগে ভেঙ্গে দেওয়া হয় রাকিবুর রহমান সাগরের নেতৃত্বের মহানগর ছাত্রদলের কমিটি ও কায়সার রিফাতের কৃষকদলের কমিটি। আদমজী ইপিজেডের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত ও গোলা-গুলিতে লিপ্ত হয় বিএনপি-ছাত্রদলের দুই গ্রুপ। ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে বিতর্কিতদের দিয়ে গঠন করা হয় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় স্বেচ্ছাসেবক দল ও কৃষক দলের কমিটি। কমিটিতে আওয়ামী ঘনিষ্ট ও মাদকব্যবসায়ীরাও স্থান পায়।
ইমেজ পুন:প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচ্ছন্ন নেতা হিসেবে অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে আহ্বায়ক করে জেলা বিএনপির ৩৩ সদস্যের নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। নতুন কমিটির পর কিছুটা ইতিবাচক ধারায় ফিরলেও সিদ্ধিরগঞ্জের বিএনপির বিতর্কিত নেতাদের কমিটি বহাল থাকায় এবং অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা নিজ নিজ বলয়ের সেল্টারে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ায় ইমেজ আর সেভাবে পুনরুদ্ধার হয়ে উঠেনি। বিএনপির নান বিতর্কিত কর্মকান্ডে তরুণ ছাত্র-জনতাও হতাশ হয়ে পড়েন। সাধারণ মানুষ অপেক্ষা করছিলো নির্বাচন ও বিএনপির এমপি মনোনয়ন নিয়ে। এরই ফাঁকে জামায়াত নিবিরভাবে যোগাযোগ গড়ে তুলে নির্যাতিতদের সাথে।
এদিকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তরুণ ভোটার ও সাধারণ মানুষ এমনকি বিএনপি’র বহু নেতা-কর্মী বিএনপি’র প্রার্থী মনোনয়নে হতাশ হন।
অপরদিকে জামায়াত মনোনিত প্রার্থী উচ্চ শিক্ষিত ও একজন মার্জিত ব্যক্তি হওয়ায় তরুণ ও সাধারণ ভোটাররা নিরবেই ঝুঁকে পড়েন জামাতের প্রার্থীর পক্ষে।
পরিচালনায় বিতর্কিতরা:
সিদ্ধিরগঞ্জের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীবকে। নির্বাচনের প্রায় সব কর্মকান্ড পরিচালনা করা হয় শহরের হোশিয়ারী সমিতিতে বসেই। প্রায় পাঁচ শতাধিক সদস্যের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির অধিকাংশই ছিলেন বিতর্কিত, অচেনা এবং আওয়ামীঘেঁষা। বিশেষ করে ৬৭টি ভোট কেন্দ্র পরিচালনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান ব্যক্তিদের প্রায় ৯০ ভাগের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ রয়েছে। মামলা বাণিজ্য, ভুমিদস্যুতা, জবরদখল, মাদকব্যবসা, চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা, কিশোর গ্যাং ও আওয়ামী সংশ্লিষ্টতার মত গুরুতর অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে। ভোটের আগে ভোটারদের ঘরে ঘরে না গিয়ে তাঁরা মহল্লায় মহল্লায় মহড়া দেয়।
সিদ্ধিরগঞ্জের ১নং ওয়ার্ডে নির্বচন পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন জেলা বিএনপি’র সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম রবি। তাঁর ছেলে কিশোর গ্যাং টেনশন গ্রুপের সক্রিয় নেতা। এই ওয়ার্ডে দায়িত্বে ছিলেন গিয়াস উদ্দিনের ঘনিষ্ট অনুগত এম এ হালিম জুয়েল, মামলাবাজ ও ভুমিদস্যু আব্দুল্লাহ আল মামুন, চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী সালাউদ্দিন, রওশন আলী, মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাকারী জাকির, নুরউদ্দিন, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী কাদির, গাজী মনিরের ভাতিজা মাদক কারবারী সোহানসহ বহু বিতর্কিত লোকজন। ২নং ওয়ার্ডে নির্বাচন পরিচালনায় ছিলেন বহু বিতর্কিত ইকবাল হোসেন ও তাঁর বাহিনী, ৩নং ওয়ার্ডে মূল দায়িত্বে ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক দলের থানার আহ্বায়ক রিপন সরকার ও তাঁর ভাই শিপন। তাঁদের বিরুদ্ধে এই ওয়ার্ডেও মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাকারী, ডাকাত ও চাঁদাবাজদের শেল্টার দেওয়ার অভিযোগ ভোটারদের মুখে মুখে শুনা যায়। এছাড়াও চিহ্নিত সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ নেতা শাহজালাল বাদল ঘনিষ্ট কৃষক দলের সোহেল, ভুমিদস্যু, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের শেল্টারদাতা বিএনপি নেতা রসুলবাগ এলাকার রিয়াজ, ভুমিদস্যু নিমাইকাশারীর আফজাল, সাদু, ডাক্তার মান্নান এর মতো চিহ্নিত বিতর্কিত লোকজন নির্বাচন পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন। এই ওয়ার্ডে জেলা বিএনপি’র অহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ ভোটার হলেও তাঁকে কোন দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। ৪নং ওয়ার্ডে নির্বাচন পরিচালনায় জড়িত ছিলেন বিতর্কিত টিএইচ তোফা, মাহাবুব, মনা, কবিরসহ বেশ কয়েকজন। ৫নং ওয়ার্ডে দায়িত্বে ছিলেন বহু বিতর্কিত ইমাম হোসেন বাদলকে। দীর্ঘ দিন বিদেশে থেকে সে ৫ আগষ্টের পর দেশে আসে এবং গিয়াস উদ্দিনের দীর্ঘ দিনের সঙ্গী ছিলেন। এমনিভাবে সিদ্ধিরগঞ্জের ১০টি ওয়ার্ডের প্রায় প্রতিটা ওয়ার্ডে জনগণ যাদের কারণে অশান্তিতে থাকেন তাদেরকেই নির্বাচন পরিচালনার মূল ভুমিকায় রাখা হয়েছিল।
অপরদিকে জামায়াতের কর্মীরা ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। তাঁরা ভালো মানুষকে ভোট দেওয়ার প্রচারণা চালায়।
যেসকল ভোটার শেষ মুহুর্তে সিদ্ধান্ত নেন কাকে ভোট দিবেন, তারাও হতাশ হন ভোটের প্রচারণায় যুক্ত বিএনপির বিতর্কিত নেতা-কর্মীদের দেখে। আওয়ামীলীগের নিরীহ এবং চিহ্নিত একটা অংশও জামায়াতের পক্ষে ভোট দেয় বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।


































