নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মাদকের বিস্তার। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সহজেই ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদক পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও মাদক উদ্ধারের ঘটনা বাড়লেও মাদকের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। তাদের মতে, মাদক বিক্রেতারা আগেই অভিযানের খবর পেয়ে যাচ্ছে, কারণ তাদের সোর্স মিশে আছে আইনশৃংখলাবাহিনীর সাথে।
ওদিকে স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সব সরকারের আমলেই মাদকের ডিলাররা রাজনৈতিক ছাত্রছাঁয়ায় থাকে। আবার অনেক মাদক ব্যবসায়ি কতিপয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজসেও নিরাপদে মাদক কেনা-বেচা করছে। ফলে মাঝে মধ্যে আইনশৃংখলাবাহিনীর বিশেষ অভিযানেও মাদকের ভয়াবহতা কমছে না। আবার মাদক বিক্রেতারা আগেই অভিযানের খবর পেয়ে যাচ্ছে, কারণ তাদের সোর্স কৌশলে মিশে আছে আইনশৃংখলাবাহিনীর সাথে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খুচরা বিক্রেতারা গ্রেপ্তার হলেও মাদক কারবারের মূল হোতাদের অনেকেই আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের আশ্রয় কিংবা অসাধু ব্যক্তিদের সহযোগিতার কারণেই অনেক মাদক ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় থাকতে পারছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের আগাম তথ্য মাদক কারবারিদের কাছে পৌঁছে যায়। এ কারণেও অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদক উদ্ধারের একের পর এক ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে—আড়াইহাজারে এত মাদক আসছে কোথা থেকে?
মাদকবিরোধী অভিযান সংশ্লিষ্টদের মতে, আড়াইহাজারের ভৌগোলিক অবস্থান, মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক ও নৌপথের সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন কৌশলে মাদক পরিবহন করা হচ্ছে। এ কারণে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগও প্রয়োজন। অনেক পরিবার সামাজিক সংকোচের কারণে আসক্ত সদস্যদের চিকিৎসা করাতে আগ্রহী হয় না। ফলে তারা বারবার একই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে।
শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীদের মতে, তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, গ্রন্থাগারভিত্তিক কার্যক্রম ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণে সম্পৃক্ত করা গেলে মাদকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে আড়াইহাজারে একাধিক মাদকবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত মাসে গোপালদী ইউনিয়নের উলুকান্দি এলাকা থেকে ৫০ কেজি গাঁজা এবং বিশনন্দী ফেরিঘাট এলাকা থেকে ২০ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ২৫ জুন উলুকান্দি পশ্চিমপাড়া এলাকা থেকে ১০ পিস ইয়াবাসহ এক যুবক এবং ২ জুলাই পৌরসভার পায়রা চত্বর এলাকা থেকে ২২ পিস ইয়াবাসহ দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, উপজেলাজুড়ে ২০০টিরও বেশি মাদক লেনদেনের স্পট রয়েছে। গোপালদী, বিশনন্দী, চৈতনকান্দা, ব্রাহ্মন্দী, আড়াইহাজার সদর, পাঁচরুখী, পুরিন্দা, জাঙ্গালিয়া, উচিতপুরা ও কালাপাহাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনও মাদক কারবার সক্রিয়। সন্ধ্যার পর নির্জন সড়ক, বাজারের পেছনের অংশ, নদীতীর ও ফসলি জমির আড়ালকে মাদক লেনদেনের নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আড়াইহাজার পৌরসভার বাসিন্দা আব্দুল মোমেন বলেন, “আগে এলাকায় চুরি-ডাকাতির ঘটনা নিয়ে বেশি আলোচনা হতো। এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় মাদক। প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই মাদক নিয়ে মানুষের অভিযোগ রয়েছে।”
গোপালদী ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহীন মিয়া বলেন, “খুচরা বিক্রেতারা ধরা পড়লেও মূল হোতারা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে কিছুদিন পর আবার একই চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে।”
স্থানীয় শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, “মাদকের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে বিপথে যাচ্ছে। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় হুমকি।”
তবে এই সংকটের মধ্যেও ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে গোপালদী পৌরসভার রামচন্দ্রদীর দক্ষিণপাড়া। স্থানীয়দের দাবি, এলাকাবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগ, রাতের পাহারা, সামাজিক নজরদারি এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় সেখানে প্রকাশ্যে মাদকসেবন ও মাদক কারবার প্রায় বন্ধ হয়েছে। এলাকাটি এখন অন্যদের জন্য একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ বলেন, “আড়াইহাজারকে কোনোভাবেই মাদকের নিরাপদ রুট বা আশ্রয়স্থল হতে দেওয়া হবে না। যারা যুবসমাজকে ধ্বংস করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ধর্মীয় কার্যক্রম ও ইতিবাচক সামাজিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত করতে হবে।”
আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সবজেল হোসেন বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। নিয়মিত অভিযান চলছে এবং মাদক কারবারিদের তালিকা করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে পুলিশ একা এ সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সচেতন মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”
আড়াইহাজারবাসীর প্রত্যাশা, ধারাবাহিক অভিযান, মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা, মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন এবং সামাজিক প্রতিরোধ—এই চারটি উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে উপজেলাকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে অনেকটাই মুক্ত করা সম্ভব হবে।


































