নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

সোমবার,

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সোনারগাঁওয়ে অলিগলিতে কিশোর গ্যাং আতঙ্ক

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:১৮:০৭, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সোনারগাঁওয়ে অলিগলিতে কিশোর গ্যাং আতঙ্ক

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার অলিগলিতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দলবদ্ধ হয়ে চলাফেরা, মোটরসাইকেলে মহড়া, ইভটিজিং, মাদক সেবন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মারামারির অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।

মোগরাপাড়া, পিরোজপুর, শম্ভুপুরা, বৈদ্যেরবাজার, বারদী, নোয়াগাঁও, জামপুর, কাঁচপুর, সাদিপুর, সনমান্দীসহ বিভিন্ন এলাকায় উঠতি বয়সী কিশোর-তরুণদের সংঘবদ্ধ চলাফেরা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ জনের দল একসঙ্গে এলাকায় ঘোরাফেরা করে এবং নিজেদের বিভিন্ন নামের গ্রুপ হিসেবে পরিচয় দেয়।

 

সন্ধ্যার পর মোটরসাইকেলের বিকট শব্দে মহড়া, প্রকাশ্যে আড্ডা, মাদক সেবন এবং পথচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। কোথাও কোথাও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

 

হামলা, ইভটিজিং ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাও আছে

 

সোনারগাঁওয়ে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন নয়। ২০২৪ সালের মে মাসে বৈদ্যেরবাজার ট্রলার ঘাটে বিডি ক্লিনের নারী সদস্যদের উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় তাদের সঙ্গে থাকা সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় নারীসহ দুজন আহত হন এবং সোনারগাঁও থানায় মামলা হয়। পুলিশ ওই ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তারের কথাও জানিয়েছিল।

 

কাঁচপুর এলাকাতেও ‘টাইগার গ্রুপ’ নামে একটি সংঘবদ্ধ দলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ত্রাস সৃষ্টি, ছিনতাই ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালের আগস্টে র‌্যাব কাঁচপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে গ্রুপটির আট সদস্যকে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে ছয়টি ছোরা, একটি সুইচ গিয়ার চাকু ও একটি ক্ষুর উদ্ধারের কথা জানায় র‌্যাব।

 

এরপর ২০২২ সালের ডিসেম্বরেও কাঁচপুর এলাকায় ‘টাইগার গ্রুপ’-এর প্রধান বাবুসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের কাছ থেকে পাঁচটি চাকু, একটি টেটা ও একটি ফলা উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছিল র‌্যাব।

চলতি বছরেও গ্রেপ্তার

কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার অভিযোগে চলতি ২০২৬ সালেও অভিযান হয়েছে। এপ্রিল মাসে সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে ‘কিশোর গ্যাং লিডার’ হিসেবে উল্লেখ করা জঙ্গী সোহানকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই অভিযানে এক ডাকাত সর্দারকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

মাদক ও ‘বড় ভাইদের’ প্রভাবের অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে মাদক ও অপরাধের যোগসূত্র রয়েছে। কেউ কেউ মাদক বহন বা বিক্রির কাজে উঠতি বয়সী ছেলেদের ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ রয়েছে । 

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিডিও প্রচার, দলবদ্ধ হওয়ার প্রবণতা, পরিবারের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, মাদক এবং কর্মসংস্থান ও বিনোদনের সীমিত সুযোগ—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে।

অভিভাবকদের উদ্বেগ

বারদী ইউনিয়নের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, “সন্ধ্যার পর ছেলেকে বাইরে পাঠাতে ভয় লাগে। ১০-১২ জন একসঙ্গে এসে ধমক দেয়, টাকা চায়। প্রতিবাদ করলে মারধরের ভয় থাকে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক পরিবার সন্তানদের বন্ধু-বান্ধব, চলাফেরা ও অনলাইন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পর্যাপ্ত খোঁজ রাখছে না। ফলে ছোটখাটো অপরাধ থেকে ধীরে ধীরে বড় ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

পুলিশের বক্তব্য

সোনারগাঁও থানার নবাগত ওসি মুহাম্মদ আব্দুল বারিক বলেন, “মাদক, চুরি-ডাকাতি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করব। অপরাধী যেই হোক, ছাড় দেওয়া হবে না। অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, শুধু গ্রেপ্তার করে কিশোর অপরাধ কমানো সম্ভব নয়। অপরাধে জড়িত কিশোরদের পরিবারের সঙ্গে সমন্বয়, কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

সচেতন মহলের দাবি, সোনারগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের প্রকৃত বিস্তার ও সদস্যদের চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার উৎস, অস্ত্র সরবরাহকারী এবং কিশোরদের ব্যবহারকারী প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।

নইলে বয়সে কিশোর হলেও অপরাধের জগতে তাদের দ্রুত প্রবেশ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সম্পর্কিত বিষয়: