নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

সোমবার,

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

গভীর ভালোবাসা ও প্রেমের টানে আফ্রিকান তরুণী বন্দরে

নারায়ণগঞ্জ টাইমস

প্রকাশিত:২২:৫৯, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

গভীর ভালোবাসা ও প্রেমের টানে আফ্রিকান তরুণী বন্দরে

বাংলাদেশি স্বামীর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও প্রেমের টানে সুদূর আফ্রিকা থেকে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে স্বামীর বাড়িতে ছুটে এসেছেন ফান্সসিসকা নামে আফ্রিকার বংশোদ্ভুত এক তরুণী।

তিনি দেশটির স্থানীয় একটি বিমানবন্দরের সিনিয়র ম্যানেজার ও একটি ট্রভেলস এন্ড ট্যুর প্রতিষ্ঠানে সহকারি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদে কর্মরত আছেন। 

সুন্দরি, উচ্চশিক্ষিতা ও প্রতিষ্ঠিত এই বিদেশী তরুণীকে নিয়ে রীতিমতো হৈচৈ পড়ে গেছে স্বামীর বাড়িতে। গ্রামবাসিসহ স্বামীর বাড়ির মানুষদের সাথে বেশ সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এই বিদেশী তরুণী। 

শুক্রবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে দেখা মেলে এই দম্পতির। তখন দেখে মনে হয় কোন বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানে বর-বধূ বা নবদম্পতির আনন্দমুখর সময় কাটানোর দৃশ্য।

তবে বাস্তবতা হলো স্বামীর টানে বাংলাদেশে ছুটে আসা বিদেশী তরুণীর স্বামীর সাথে কোন অনুষ্ঠানে যোগদানের আনন্দঘন মূহুর্ত। মায়াভরা কন্ঠে টুকটাক কথাও বলছেন বাংলা ভাষায়। 

বিদেশী তরুণীর মুখে আন্তরিকার সাথে বাংলা ভাষায় এমন কথা শুনে বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়ে যান।  নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মুসাপুর ইউনিয়নের ত্রিবেনী গ্রামের বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে ও তিন বোনের আদরের একমাত্র ভাই সাজেন হোসেন (২৭) উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পাড়ি দেন বাহরাইনে।

সেখানে কয়েক বছর কাটিয়ে ২০১৮ সালে চলে যান আফিকার সী সেলস আইল্যান্ডে। সেখানে একটি পাঁচ তারকা হোটেলে সেফ হিসেবে চাকরি নেন তিনি। দীর্ঘ আলাপচারিতায় ফান্সসিসকার সাথে পরিচয়ের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নিজের জীবনের মধুর গল্পটা এভাবে বর্ণনা করেন সাজেন হোসেন। 

তিনি বলেন, হোটেলটিতে অফিসের কাজে প্রায় সময় আসা যাওয়ার সুবাদে ২০২০ সালের নভেম্বরে সাজেনের পরিচয় হয় সী সেলস বিমানবন্দরের সিনিয়র ম্যানেজার অবিবাহিতা তরুণী ফ্রান্সসিসকার (৩০) সাথে। উচ্চ বিলাসিতা ও অহংকারবিহীন সুন্দর মনের এই আফ্রিকান তরুণীর সাথে অল্পদিনেই বন্ধুত্ব গড়ে উঠে হোটেলটির সুদর্শন সেফ বাংলাদেশী যুবক সাজেনের সাথে।

এক পর্যায়ে দুজনের মধ্যে গভীর ভালোবাসা ও প্রেমের  সম্পর্ক গড়ে উঠলে ২০২১ সালে নিজ নিজ পরিবারের মতামত নিয়ে সেখানে বিয়ে করেন তারা। স্বামীকে খুশি করতে তার নামের অংশ যুক্ত করে নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ফ্রান্সসিসকা হোসাইন। গত তিন বছর ধরে সাজেন-ফ্রান্সসিসকার দাম্পত্য জীবন বেশ সুখে শান্তিতেই কাটছে। 

তবে দীর্ঘ সাত বছর প্রবাসে থাকা সাজেন নিজের বাবা-মা ও বোনদের দেখতে কর্মস্থল থেকে কয়েক মাসের ছুটি নিয়ে গত ১৬ জানুয়ারি বাংলাদেশে নিজ বাড়িতে আসেন। দেশে এসে প্রিয়তমা স্ত্রী ফ্রান্সসিসকার সাথে নিয়মিত যোগাযোগও রাখেছেন। 

তবে প্রাণপ্রিয় স্বামীর অনুপস্থিতিতে গভীর শূণ্যতা অনুভব করেন ফ্রান্সসিসকা। স্বামীকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন তিনি। স্বল্প সময়ের ছুটি পেয়েই (চৌদ্দ দিন) গত ২ ফেব্রুয়ারি ছুটে আসেন বাংশাদেশে। 

ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে স্বামীপাগল এই বিদেশী বধূকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসেন সাজেন ও তার পরিবারের সদস্যরা। 

সাজেনের স্বজনরা জানান, উদার মানসিকতা ও সুন্দর ব্যবহারের কারণে মাত্র মাতদিনেই স্বামীর পরিবার, তার আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশিদের মন জয় করেন বিদেশী তরুণী ফ্রান্সসিসকো।

আসার পর থেকেই স্বামী ও স্বামীর পরিবারের সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণসহ বাইরে বেড়াতেও যাচ্ছেন। তার আন্তরিকতা ও ভালোবাসাসুলভ আচরণে মুগ্ধ এলাকাবাসিসহ সাজেনের পরিবার ও নিকট আত্মীয়-স্বজনরা। 

সবার আদর ভালোবাসায় সিক্ত আফ্রিকান সিক্ত তরুণীও। স্বামীর বাড়ির গুরুজনদের বাংলায় সালাম দেয়া সহ বাংলা ভাষায় সবার প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশও করছেন তিনি।

বাংলাদেশের মানুষের সীমাহীন আবেগ ও ভালোবাসা সহ বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জনের কথাও জানান আফ্রিকান তরুণী ফ্রান্সসিকো হোসাইন।

ফ্রান্সসিসকা তার নিজের ভাষায় ইংরেজীতে বলেন, স্বামীর বাড়ির মানুষ আমাকে এতো আদর যত্ন করছে, এতো ভালোবাসা দিচ্ছে, এতে আমি মুগ্ধ। আমি ভাবতেই পারিনি বাংলাদেশের মানুষ এতো ভালো, এতো আন্তরিক এবং এতো উদার। 

আমি যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই খুব আদর ভালোবাসা ও সম্মান পাচ্ছি। আমার স্বামীর পরিবারের মধ্য দিয়ে আমি বুঝে নিয়েছি পুরো বাংলাদেশের মানুষ ওদের মতোই। 

এমন পুত্রবধূ পেয়ে খুশির সীমা নেই সাজেন হোসেন এর বাবা-মায়ের। বিদেশী পুত্রবধূকে খুব আপন করেই নিয়েছেন তারা। 

সাজেনের বাবা আবদুস সাত্তার বলেন, আমার ছেলে আফ্রিকান মেয়ে বিয়ে করেছে। আমার ছেলে তার বউ নিয়ে দেশে এসেছে। ছেলে ও বৌমাকে দেখে আমি অনেক খুশি। আমার খুব আনন্দ লাগছে। বৌমা অনেক ভালো মেয়ে। 

পুত্রবধূর প্রশংসা করতে গিয়ে সাজেনের মা আফসানা আক্তার বলেন, সাজেন আমাদের একমাত্র ছেলে। ছোটবেলা থেকে আমার ছেলে বলতো তার খুব শখ সে বিদেশে যাবে। বিদেশে গিয়ে বিদেশি মেয়ে বিয়ে করবে। আল্লাহ তার ইচ্ছা পূরণ করেছেন। 

আমাদের বিদেশি বৌমা অনেক লক্ষী। কোন অহংকার গরিমা নাই। আমার পরিবারের সবাইকে খুব আপন করে নিয়েছে। মুরুব্বিদের সম্মান দিয়ে কথা বলে। তার আন্তরিকতা ও ব্যবহারে সবাই বিদেশী বৌমার খুব ভক্ত হয়ে গেছে। এমন পুত্রবধূ পেয়ে আমরা খুবই গর্বিত। 

বিদেশী স্ত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ আফ্রিকা প্রবাসী বাংলাদেশী যুবক সাজেন হোসেনও। তিনি জানান, বাংলাদেশী মুসলমান যুবককে বিয়ে করার পর থেকে আফ্রিকান তরুণী ফ্রান্সসিসকা পশ্চিমা সংস্কৃতি ও ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ হারাম খাবার পরিহার করে ইসলামি শরিয়তের বিধিবিধান মেনে চলছেন।

 ক্লাব, বার ও পার্টিতে যাওয়া বাদ দিয়ে পোশাক আশাকেও বজায় রাখছেন ভদ্রতা ও শালীনতা। এমন স্ত্রী পেয়ে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করছেন সাজেন। 
 

সম্পর্কিত বিষয়: