ফাইল ফটো
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের মেঘনা নদী থেকে রাতের আধাঁরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। অপরিকল্পিত ভাবে এ বালু উত্তোলনের কারণে হুমকির মুখে পরেছে উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী আনন্দবাজার হাটসহ এর আশপাশের এলাকা।
গত সপ্তাহ খানেক ধরে রাতের আঁধারে দশ থেকে পনেরটি ড্রেজার বসিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এ বালু উত্তোলন করলেও এর বিরুদ্ধে নিরব ভূমিকা পালন করছে স্থানীয় প্রশাসন।
স্থানীয় এলাকাবাসী জানায়, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে মুন্সিগঞ্জের চাকদা ড্রেজিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেঘনা নদীর সোনারগাঁওয়ের বারদী এলাকা থেকে আনন্দবাজার এলাকা পর্যন্ত ড্রেজিংয়ের কাজ পায়।
ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে স্থানীয় ব্যবসায়ী মোমেন সিকদার ও বিএনপি নেতা মাসুম রানা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট করে সরকারী নিয়মের তোয়াক্কা না করে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু কাটা শুরু করে। দিনের আলো ফোটার আগেই তারা উত্তোলন করা বালু বাল্কহেড এর মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছে।
এলাকাবাসী স্থানীয় প্রশাসন ও সংসদ সদস্যকে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি বারবার অবহিত করলেও প্রশাসন এ বিষয়ে কোন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এলাকাবাসীর দাবী, প্রতিদিন রাতের আঁধারে ১০ থেকে ১৫টি ড্রেজার ক্রমাগতভাবে মেঘনা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে আনন্দবাজার, ছনপাড়া, টেকপাড়া, খামারগাঁও ও পূর্ব দামোদরদী এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ।
যেখানে বালু কাটা হচ্ছে সেখানে কোন ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন না থাকলেও বিভিন্ন লবিং ও তদবিরের কারণে বিআইডব্লিউটিএ এখানে ড্রেজিং এর দরপত্র আহ্বান করেছে। অপরিকল্পিতভাবে এ বালু উত্তোলনের কারণে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে তীব্র নদী ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুধু সোনারগাঁও নয় পাশর্^বর্তী মেঘনা উপজেলার চালিভাঙ্গা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুল বারেক এবং নলচর গ্রামের রবিউল্লাহ রবি সহ বিএনপির একটি সিন্ডিকেট এ অবৈধ বালু উত্তোলনে জড়িত রয়েছে।
আনন্দবাজারের ব্যবসায়ীরা বলেন, নদীর তীর ঘেঁষে বালু উত্তোলনের ফলে ভয়াবহ নদীভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভাঙন শুরু হলে হাটের দোকানপাট, সড়ক ও আশপাশের বসতবাড়ি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, রাতে নদীতে ড্রেজারের শব্দে ঘুমাতে পারি না। বাঁধা দিলে মামলা-হামলার ভয় দেখায়। প্রশাসন সবই জানে, কিন্তু এ ব্যাপারে কেউ কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে মোমেন সিকদারের ছোট ভাই মামুন সিকদার বলেন, “বিআইডব্লিউটিএ’র নিয়ম অনুযায়ী ইজারাদার নদী খননের কাজ করছে। আমার বড় ভাই শুধু কাজটি দেখভাল করছেন। যদি কেউ রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু কাটে, তার দায়ভার আমাদের নয়।
এ বিষয়ে পিরোজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও যুবদল নেতা মাসুদ রানা বলেন, আমি নদী থেকে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নই। সেখানে বালু কাটার জন্য আমার ড্রেজার ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
সোনারগাঁওয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রতœসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক কবি শাহেদ কায়েস বলেন, ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর আমরা স্থানীয় বালু সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ‘মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন’ পরিচালনা করেছি।
সেই আন্দোলনের ফলে চরটি সম্পূর্ণ বিলীন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেলেও এর ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ওই এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ ছিল। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে আবারও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে আনন্দবাজার সংলগ্ন নুনেরটেক এলাকায় রাতের অন্ধকারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলের জনবসতি, পরিবেশ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং জলজ প্রাণপ্রকৃতি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। আমরা এই বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি। জনস্বার্থে যত দ্রুত সম্ভব অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
এবিষয়ে সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, বিআইডব্লিউটিএ’র অনুমতি সাপেক্ষে নদী খননের কাজ চলছে তবে রাতের আঁধারে বালু লুটপাটের বিষয়টি আমার জানা নেই। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। রাতের বেলা নদীতে অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ। জনবল সংকটও আছে। তবুও আমরা চেষ্টা করছি।
সোনারগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ গোলাম সারোয়ার বলেন, প্রশাসন অভিযানে গেলে পুলিশ প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোঃ রায়হান কবির জানান, রাতের আধাঁরে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।


































