কোচিংয়ের বকেয়া ফি পরিশোধ না করায় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের ২১ শিক্ষার্থীকে প্রায় এক ঘণ্টা প্রধান শিক্ষকের কক্ষে দাঁড় করিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে ১৫ জন ছাত্র ও ৬ জন ছাত্রী। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন অভিভাবকেরা।
ঘটনাটি সিদ্ধিরগঞ্জের নাসিক ১ নম্বর ওয়ার্ডের পাইনাদী নতুন মহল্লা এলাকার পিএম একাডেমি-সংলগ্ন আল বালাগ স্কুলে ঘটেছে বলে জানা গেছে।
বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, গত সোমবার (১০ আগস্ট) ৮২ শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে ১৫ জন ছাত্র ও ৬ জন ছাত্রীকে প্রধান শিক্ষক ফারুক হোসেন তাঁর কক্ষে ডেকে পাঠান। তাদের কাছে কোচিংয়ের বকেয়া ফি দাবি করা হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিদ্যালয়ে কোচিং ফি হিসেবে প্রত্যেকের কাছ থেকে এক হাজার টাকা নেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীরা জানায়, এ সময় তারা পরিবারের আর্থিক সমস্যার কথা জানিয়ে বকেয়া ফি পরিশোধের জন্য সময় চায়। কেউ কেউ পরে টাকা পরিশোধের প্রতিশ্রুতিও দেয়। এরপরও তাদের প্রায় এক ঘণ্টা প্রধান শিক্ষকের কক্ষে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক জানান, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে অস্বস্তি ও নার্ভাস অবস্থায় দেখা যায়। পরে বিষয়টি বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, “আমি প্রধান শিক্ষকের কাছে বকেয়া টাকা একসঙ্গে পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। এরপরও আমার মেয়েকে তাঁর কক্ষে নিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। গত দুই দিন ধরে ঠিকমতো খাচ্ছে না, স্বাভাবিক আচরণও করছে না।”
আরেক অভিভাবক বলেন, “কোচিংয়ের টাকা না দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের এভাবে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা আগে কখনো শুনিনি। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তবে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে চাইছেন না।”
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের কোচিং কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তবে এবার বকেয়া কোচিং ফি আদায়ে শিক্ষার্থীদের এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখার ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অভিভাবকদের প্রশ্ন, বিদ্যালয়ের আর্থিক বিষয়ে কোনো সমস্যা থাকলে তা অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান না করে শিক্ষার্থীদের কেন এর দায় নিতে হবে? তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ভবিষ্যতে যেন কোনো শিক্ষার্থীকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, কোনো শিক্ষার্থীর বকেয়া ফি থাকলে তা অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করা উচিত। অর্থনৈতিক কারণে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বা অপমানের মুখে ফেলা তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময়ে এ ধরনের ঘটনা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়ও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে আল বালাগ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফারুক হোসেন বলেন, “এটি একটি বেসরকারি স্কুল। আমরা স্কুলের মালিকদের পরামর্শে তাদেরকে আমার রুমে আসতে বলি কোচিং ফি আদায় করার জন্য।”
বিদ্যালয়ে কোচিং কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোচিং নিষিদ্ধের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে এ সময় তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, “সিদ্ধিরগঞ্জের কোন স্কুলে কোচিং হয় না?”
ইউএনওর বক্তব্য
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, “শিক্ষার্থীদের কোচিং ফি দিতে না পারায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে দাঁড় করিয়ে রাখার অভিযোগটি আমি মাত্রই শুনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের মানসিক চাপ বা অপমানের মুখে ফেলা হয়ে থাকলে তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কীভাবে ফি নেওয়া হচ্ছে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বা বিধিমালা কী রয়েছে, সেটিও যাচাই করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের পরই প্রকৃত ঘটনা ও দায়ীদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।


































