নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

শনিবার,

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সন্ধ্যা নামলেই স্থবির নগরী: চাষাঢ়ায় চরম বিশৃঙ্খলা ও ভোগান্তি

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:১৯:৩১, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সন্ধ্যা নামলেই স্থবির নগরী: চাষাঢ়ায় চরম বিশৃঙ্খলা ও ভোগান্তি

দিনের আলো নিভতেই বদলে যায় শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের চালচিত্র। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়াসহ ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে নেমে আসে চরম বিশৃঙ্খলা। অপরিকল্পিত যানবাহন চলাচল, মূল সড়কজুড়ে ভ্রাম্যমাণ দোকানের বিস্তার, ক্ষমতার দাপটে চাঁদাবাজি এবং নড়বড়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অচল হয়ে পড়ে পুরো শহর।

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই চাষাঢ়া মোড় থেকে শুরু করে খাজা সুপার মার্কেটের সামনে মূল সড়কের অর্ধেকাংশ দখলে নেয় ব্যাটারিচালিত রিকশা ও মিশুক। যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠা চালকেরা কোনো প্রকার নিয়মনীতি না মেনে রাস্তার ঠিক মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে রাখেন। ফলে মুহূর্তের মধ্যেই চাষাঢ়া গোলচত্বর থেকে চারপাশের সংযোগ সড়কগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ ও অবরুদ্ধ শৃঙ্খল তৈরি হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর খাজা সুপার মার্কেটের সামনে যে হট্টগোল ও যানজট তৈরি হয়, তা এখন নগরবাসীর নিত্যদিনের যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। 

যানজটের এই চরম পরিস্থিতির মধ্যেই মূল সড়কের ওপর অবৈধভাবে গড়ে ওঠা খাবারের দোকানগুলো আরেকটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্ধ্যার পর বঙ্গবন্ধু সড়ক, চাষাঢ়া মোড়, শহীদ মিনার, চাষাঢ়ার আল জয়নাল ট্রেড সেন্টার ও মহিলা কলেজ সংলগ্ন রাস্তায় সারি সারি ভ্রাম্যমাণ দোকান বসানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব দোকান বসানোর নেপথ্যে কাজ করছে স্থানীয় বিএনপি নেতা ও প্রভাবশালী একটি চক্রের ছাঁয়া। প্রতিদিন লাখ টাকার চাঁদা বাণিজ্যের বিনিময়ে ব্যস্ততম জনপথের ওপর খাবারের পসরা সাজানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এই অবৈধ আয়ের ভাগ পৌঁছে যায় সংশ্লিষ্ট নানা স্থানে, যার কারণে বছরের পর বছর ধরে এই অনিয়ম স্থায়ী রূপ নিয়েছে।

অন্যদিকে সন্ধ্যার পর ফুটপাত পুরোপুরি দখল হয়ে যায়। এতে চরম বিপাকে পড়েন সাধারণ পথচারীরা। ব্যস্ততম চাষাঢ়া থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু সড়ক দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে হেঁটে চলার ন্যূনতম সুযোগও আর অবশিষ্ট থাকে না। বাধ্য হয়ে পথচারীদের নামতে হচ্ছে চলন্ত যানবাহনের রাস্তায়, যা তৈরি করছে মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য সন্ধ্যায় এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করা এক ধরণের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু সড়ক দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন পথচারী সাবিকুন নাহার। নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একদিকে যানজটের কারণে রিকশা নিলে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। অন্যদিকে হেঁটে যাব তারও উপায় নেই। ফুটপাত বলে কিছু খালি নেই, হাঁটার সময় বারবার পুরুষদের সাথে ধাক্কা খেতে হয়। একজন নারী হিসেবে এই পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্বস্তিকর। বাধ্য হয়ে চলন্ত গাড়ির মূল সড়ক দিয়েই হাঁটতে হচ্ছে।

ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে নগর কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। সিটি কর্পোরেশনের তদারকি ও উচ্ছেদ দলের সাথে হকারদের প্রতিদিন যেন এক নাটকীয় 'চোর-পুলিশ খেলা' চলে। কর্পোরেশনের গাড়ি বা প্রশাসনিক টিম এলাকায় প্রবেশ করলেই মুহূর্তের মধ্যে মালামাল গুটিয়ে সরে পড়ে হকাররা। কিন্তু উচ্ছেদ দল স্থান ত্যাগ করা মাত্রই কয়েক মিনিটের মধ্যে পুনরায় একই বিশৃঙ্খল রূপ ফিরে আসে। এই লুকোচুরি খেলাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে প্রশাসনিক তৎপরতা।

সেইসাথে সন্ধ্যা নামলে চাষাঢ়ার পাশাপাশি শহরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্পট যেমন ২ নম্বর গেট, নবাব সিরাজউদৌলা সড়ক, কালিরবাজার এলাকাতেও একই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। প্রধান প্রধান মোড়গুলোতে ট্রাফিক পুলিশ সদস্য ও যানজট নিরসনে দায়িত্বরত স্বেচ্ছাসেবীদের উপস্থিতি চোখে পড়লেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকা অনেকটাই নিষ্ক্রিয় ও অসহায়। যত্রতত্র বাস থামানো  ও অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে রাস্তার প্রশস্ত সংকুচিত হয়ে পড়ে। এতে অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি পরিষেবার যানবাহনগুলোকেও যানজটে আটকে থাকতে দেখা যায়। শহরের দুইপ্রান্তে থাকা ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল ও খানপুর হাসপাতালে রোগী আনা-নেওয়াও কষ্টকর হয়ে পড়ে। 

শহরের নাগরিক সমাজ মনে করছেন, প্রশাসনিক উদাসীনতা, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের স্বার্থের কারণেই  শহর বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। অবিলম্বে চাষাঢ়া,বঙ্গবন্ধু সড়ক, ২ নম্বর গেট, কালিরবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ সব পয়েন্টের সড়ক দখলমুক্ত করা, অবৈধ যানবাহন পার্কিং বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ট্রাফিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী নগরবাসী।

সম্পর্কিত বিষয়: