পাঁচ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে বড় ধরনের পালাবদল ঘটে। একসময় জেলার রাজনীতিতে দাপট দেখানো আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এখন আত্মগোপনে, কেউ কারাগারে। প্রকাশ্য রাজনীতিতে নেই তারা।
অথচ রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হওয়ার পরও তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেকটাই চলছে। আর এসব ব্যবসা সচল রাখতে বিএনপির স্থানীয় একটি অংশ নেপথ্যে ভূমিকা রাখছে। এমন আলোচনা এখন নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলে।
নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা রয়েছে গার্মেন্টস, জাহাজ, পরিবহন, ঝুট, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে।
৫ আগস্টের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সামনে না থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম থেমে যায়নি। তাদের অনুপস্থিতিতে ব্যবসা চালু রাখা, শ্রমিক-কর্মচারীদের বিষয় সামলানো, স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা এবং নানা জটিলতা মোকাবিলায় বিএনপির কিছু নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠদের ভূমিকা রয়েছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
ব্যবসা সচল রাখার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের জামিনের ক্ষেত্রেও বিএনপিপন্থি আইনজীবী ও নেতাদের একটি অংশ সহযোগিতা করছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। কোথাও গার্মেন্টস, কোথাও জাহাজ ব্যবসা, আবার কোথাও শেয়ার ও অন্যান্য ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখভালের ক্ষেত্রেও বিএনপির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে নিজ দলের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে।
তবে এই সম্পর্কের সূত্রপাত ৫ আগস্টের পর নয়। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে রাজনৈতিকভাবে বিএনপির সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের বিরোধ থাকলেও নারায়ণগঞ্জে দুই দলের একটি অংশের মধ্যে ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক সমঝোতার পথ খোলা ছিল। প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিরোধের আড়ালে চলেছে দর-কষাকষি ও সুবিধা আদায়ের রাজনীতি—এমনটাই বলছেন স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ব্যক্তিরা।
এর একটি দৃশ্যমান কেন্দ্র ছিল চাষাঢ়ার রাইফেল ক্লাব। আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপির অনেক নেতার প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সেখানে যাতায়াত ছিল বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। সেখানে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, নেগোশিয়েশন এবং বিভিন্ন স্বার্থের সমাধান করা হতো বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
রাইফেল ক্লাবকে ঘিরে সেই সময়ের রাজনীতি ছিল নারায়ণগঞ্জের ক্ষমতার কাঠামোরই একটি অংশ। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে ক্লাবটিকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের প্রভাববলয়ের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেও দলের কিছু নেতার সেখানে যাতায়াত ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে দর-কষাকষি নিয়ে তখন থেকেই নানা আলোচনা ছিল।এছাড়া নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের যে রুমটি শামীম ওসমান ব্যবহার করতেন সেখানেও বিএনপি নেতাদের যাতায়াত ছিল। আবার প্রকাশ্যে সেলিম ওসমানের মঞ্চে দেখা গেছে বিএনপি ঘরোয়ানার কতিপয় নেতাদের।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, রাইফেল ক্লাব, নারায়ণগঞ্জ ক্লাব এবং সেলিম ওসমানের উইজডমে সাক্ষাৎ নিছক সৌজন্য বিনিময় ছিল না। ব্যবসা টিকিয়ে রাখা, স্থানীয় বিরোধ মেটানো, রাজনৈতিক চাপ সামলানো কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষায় ওই সময়ের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সমঝোতা করতেন কেউ কেউ। বিনিময়ে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পাওয়ার কথাও শোনা যায়।
এখন সেই পুরোনো হিসাবই নতুন করে সামনে এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যারা রাজনৈতিকভাবে অদৃশ্য, তাদের অনেকের ব্যবসা যখন সচল, তখন প্রশ্ন উঠছে—এই ব্যবসাগুলোকে টিকিয়ে রাখছে কারা?
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের অনুপস্থিতিতে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা, প্রতিষ্ঠানের নানা সমস্যা মেটানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা বা প্রভাব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিএনপির একটি অংশ সক্রিয়। অর্থাৎ ক্ষমতার পালাবদলে রাজনৈতিক পক্ষ বদলালেও পুরোনো স্বার্থের সমীকরণ পুরোপুরি বদলায়নি।
শুধু বিএনপির নেতাদের ক্ষেত্রেই নয়, নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। শহরে আওয়ামী লীগ ও তাদের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন ও সমঝোতার বিষয়টি অনেকের কাছেই এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ বলে আলোচনা রয়েছে।
নিতাইগঞ্জের কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী এখনো আত্মগোপনে থাকা বা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বার্থে আগের সম্পর্ক ধরে রেখেছেন এমন কথাও স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে শোনা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে আর্থিক লেনদেন ও আওয়ামী লীগের নেতাদেরকে অর্থায়নের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের বড় গার্মেন্টস ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের একটি অংশের সঙ্গেও আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ মহলের পুরোনো সম্পর্ক এখনো অটুট রয়েছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে। রাজনৈতিক পালাবদলের পরও এসব সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা এবং আর্থিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকার কথাও শোনা যাচ্ছে।
ফলে ৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জে রাজনীতির দৃশ্যপট বদলালেও অর্থনীতি ও ব্যবসার অন্দরমহলের সমীকরণ কতটা বদলেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান, আর আড়ালে তাদের ব্যবসা ও স্বার্থ রক্ষার যে চিত্র সামনে আসছে, তা নিয়েই এখন আলোচনা বেশি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির কিছু নেতা আওয়ামী লীগ আমলে টিকে থাকার জন্য যে সমঝোতার রাজনীতি করেছিলেন, ক্ষমতার পালাবদলের পর তারই প্রতিদান দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
অর্থাৎ তখন ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে নেওয়া সুবিধার বিনিময়ে এখন তাঁদের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর একটি অলিখিত হিসাব কাজ করছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
কার সঙ্গে কার ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব, কে কাকে আর্থিক সহায়তা করছেন, কার ব্যবসা কে দেখভাল করছেন এবং কোন জামিনের পেছনে কার ভূমিকা রয়েছে এসব বিষয় সামনে আসায় নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে পুরোনো সম্পর্কের নতুন হিসাব নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। মোট কথা আওয়ামী থেকে সুবিধা পাওয়া কতিপয় বিএনপির নেতারা ঋন পরিশোধ করছে! এমনটাই মনে করছে বিএনপির তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা।


































