নারায়ণগঞ্জ টাইমস | Narayanganj Times

সোমবার,

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তৈমূর ডুবলেন, সঙ্গে ডুবালেন!

নারায়ণগঞ্জ টাইমস:

প্রকাশিত:২১:০১, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তৈমূর ডুবলেন, সঙ্গে ডুবালেন!

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একসময় অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার ছিলেন বিএনপির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-মোকদ্দমা, দলীয় পদ-পদবি এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে ছিল তার দৃশ্যমান প্রভাব। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হওয়া দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়েও নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি।

একসময় তাকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জে তৈরি হয়েছিল পরিবার ও অনুসারীদের একটি শক্ত রাজনৈতিক বলয়। পরিবারের একাধিক সদস্য ছিলেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের রাজনীতিতে সক্রিয়। ঘনিষ্ঠ নেতাদের অনেকেই পেয়েছিলেন দলীয় পদ, নির্বাচনী পরিচিতি ও সাংগঠনিক অবস্থান। কিন্তু তৈমূরের নিজের রাজনৈতিক অবস্থান যতটা শক্তিশালী থেকে দুর্বল হয়েছে, তার চারপাশের সেই বলয়ও ততটাই প্রভাব হারিয়েছে যা এখনো বিদ্যমান।

তৈমূরের রাজনৈতিক উত্থানের গুরুত্বপূর্ণ সময় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমল। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি বিআরটিসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। এর আগে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বও পালন করেন। ২০০৩ সালে তাকে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক করা হয়। পরবর্তী সময়ে জেলা বিএনপির সভাপতি এবং মহানগর বিএনপির নেতৃত্বেও আসেন তিনি।

ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তৈমূর। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। একই সময়ে বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র নেতা তারেক রহমানের আইনজীবী হিসেবেও তিনি আইনি লড়াই করেন বলে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
পরবর্তীতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদে জায়গা পান তৈমূর। ফলে নারায়ণগঞ্জের জেলা রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে কেন্দ্রীয় বিএনপিতেও তার প্রভাব তৈরি হয়। দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক অবস্থানই তার চারপাশে একটি নিজস্ব অনুসারী বলয় তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

কিন্তু সেই প্রভাবের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে নির্বাচনী রাজনীতিতে। ২০১১ সালের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি তাকে মেয়র প্রার্থী করলেও ভোট গ্রহণের কয়েক ঘণ্টা আগে দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘটনাটি দীর্ঘদিন ‘তৈমূরকে বসিয়ে দেওয়া’ হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে।

দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে সরে দাঁড়ানোর পরও বিএনপির সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক অটুট ছিল। বরং পরবর্তী এক দশকে তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একজন হিসেবে সক্রিয় থাকেন। কিন্তু ২০২২ সালের সিটি নির্বাচন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও তৈমূর আলম খন্দকার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামেন। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় নির্বাচনের আগেই তাকে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এরপরও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি তৈমূর। ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন তিনি।

নির্বাচনের পর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সব পর্যায়ের পদ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে তার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট এ টি এম কামালকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয় সেসময়ে। এই বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে বিএনপিতে তৈমূরের দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের কার্যত অবসান ঘটে।

এরপর তৈমূরের রাজনৈতিক পরিচয় বদলে যায়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি তৃণমূল বিএনপিতে যোগ দিয়ে দলটির মহাসচিব হন। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের ফল তার রাজনৈতিক অবস্থানের পতনকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। আওয়ামী লীগের প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজীর কাছে পরাজিত হয়ে জামানতও বাজেয়াপ্ত হয় তার। 

একইসাথে তৈমূরের নিজের এই রাজনৈতিক পতনের প্রভাব পড়ে পরিবারের উপরও। বিশেষ করে তৈমূরের ছোট ভাই মাকছুদুল আলম খন্দকার, যিনি খোরশেদ নামে পরিচিত, তার উপর। তৈমুর বলয়ে পরিচিত ও শক্তিশালী মুখ ছিলেন তিনি। ২০০৩ সালে পৌরসভা নির্বাচনের মাধ্যমে তার নির্বাচনী রাজনীতিতে পথচলা শুরু। এরপর ২০১১ ও ২০১৬ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোটে কাউন্সিলর নির্বাচিত খোরশেদ।

করোনাভাইরাস মহামারির সময় দাফন ও সৎকারসহ নানা মানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে খোরশেদ আলোচিত হন। একই সঙ্গে তিনি মহানগর যুবদলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ছিলেন। বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে থাকা এই নেতা  বিগত সরকারের সময়ে একাধিকবার কারাবন্দীও হতে হয়েছে।

অর্থাৎ তৈমূরের রাজনৈতিক প্রভাবের সময় তার ছোট ভাই খোরশেদও নির্বাচনী ও সাংগঠনিক রাজনীতিতে নিজের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন। কিন্তু তৈমূর বিএনপির মূলধারা থেকে ছিটকে পড়ার পর সেই পারিবারিক রাজনৈতিক বলয়ের আগের সমন্বিত শক্তিও আর দেখা যায়নি। খোরশেদের ব্যক্তিগত পরিচিতি ও মানবিক কর্মকাণ্ড থাকলেও তৈমূরকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক বলয় একসময় দৃশ্যমান ছিল, সেটি আগের মতো সক্রিয় নেই।

তৈমূরের মেয়ে ব্যারিস্টার মার-ই-য়াম খন্দকারও আইন ও রাজনীতিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ২০২০ সালের ১৪ মার্চ সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সদস্য পদে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হওয়ার তথ্যও রয়েছে তার সম্পর্কে। আইন পেশার পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের আইনগত অধিকার এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করছেন তিনি। 

তৈমূরের ভাগ্নেদের মধ্যেও ছিল বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়তা। রাশিদুর রহমান রশো একসময় ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৯৫ সালে নারায়ণগঞ্জ কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং পরে সভাপতি হন তিনি। এরপর নারায়ণগঞ্জ থানা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক, মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং পরে মহানগর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। রাশিদুর রহমান রশোর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে একাধিক মামলা হয়েছে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে কারাভোগ করেছেন তিনি। তৈমূরের আরেক ভাগ্নে মাহাবুবুর রহমানও মৎস্যজীবী দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ফলে তৈমূরকে ঘিরে তৈরি রাজনৈতিক বলয়টি ছিল শুধু কয়েকজন অনুসারীর সমষ্টি নয়। তার নিজের পরিবারেই ছিল নির্বাচনী রাজনীতি, ছাত্রদল, যুবদল ও বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক মুখ। তৈমূরের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব তাদের অনেকের রাজনৈতিক পথকে দৃশ্যমান করতে ভূমিকা রেখেছিল।

একসময় সেই তৈমূরের নাম ছিল বিএনপির রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী পরিচয়। তার সঙ্গে থাকা নেতা-কর্মীরা তার সাংগঠনিক প্রভাবের ছায়ায় রাজনীতি করতেন। কেউ ছিলেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, কেউ অঙ্গসংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে, কেউ আবার রাজপথের সক্রিয় কর্মী। কিন্তু বিএনপির সঙ্গে তৈমূরের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর তাদের চলে যেতে হয় পর্দার আড়ালে। 

তৈমূরের রাজনৈতিক পতনের সবচেয়ে বড় দিকটি এখানেই। তিনি শুধু নিজেই বিএনপির রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েননি; তার সঙ্গে দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে যুক্ত একটি পরিবার ও অনুসারী বলয়ও হারিয়েছে আগের কেন্দ্রীয়তা। একসময় যে নামকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে হিসাব-নিকাশ হতো, সেই নাম এখন বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে।

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তাই ‘তৈমূর ডুবলেন, সঙ্গে ডুবালেন’ কথাটি শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিণতির ইঙ্গিত নয়; বরং তার ছায়ায় গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক বলয়ের ডুবে যাওয়ার প্রতিচ্ছবি।

সম্পর্কিত বিষয়: